সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। বিএনপির বিরুদ্ধে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা, গণভোটের রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাদের দাবি, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক আপস নয়, বরং জনগণের দেওয়া গণরায়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বুধবার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বক্তব্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, কূটনীতিক, মানবাধিকারকর্মী এবং জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে বিএনপি নেতারা "অন্তহীন প্রতারণার দলিল" হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রকৃতপক্ষে জনগণের রায়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার ভাষায়, যদি বলা হয় জনগণ গণভোটের চারটি প্রশ্ন বুঝতে পারেনি, তাহলে একই যুক্তিতে বিএনপির ৩১ দফাও জনগণ বোঝেনি বলে ধরে নিতে হয়। এ ধরনের বক্তব্য জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও বিচারবোধকে অবমূল্যায়ন করে।
তিনি বলেন, জনগণ সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে যে মতামত দিয়েছে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন বা পুরোনো, কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদ কিংবা ফ্যাসিবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং তা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হবে।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। কেউ যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের আত্মত্যাগকে অবমাননা করার চেষ্টা করে, জনগণই তার জবাব দেবে। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যেগুলো বিরোধী দলগুলোও সমর্থন দিয়েছে। তবে সরকারের অভ্যন্তরে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা প্রকাশ্যে নয়, নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্র ও সরকারের ক্ষতি করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, চারপাশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা প্রয়োজন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে কর্নেল অলি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু অংশ এবং নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করা কয়েকজন ব্যক্তি ১১ দলীয় জোটকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন। তবুও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, বিএনপি মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে মূলধারার রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অতীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পরও ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি জনগণের বহু প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার নিজেদের রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি ৩১ দফার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। এতে দলটির ঘোষিত অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, জুলাই শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং আহত জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান।
বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।