শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) এক ঐতিহাসিক আবহে শপথ নিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রথম একটি নির্বাচিত সংসদ যাত্রা শুরু করল। তবে শপথ গ্রহণের প্রথম দিনেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিভাজন।
বিএনপির শপথ ও ‘সংস্কার পরিষদ’ বর্জন
সকাল পৌনে ১১টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে শপথ নেন বিএনপির ২০৯ জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটির সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেন। শপথ অনুষ্ঠানের আগেই সংসদ ভবনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ দলের এই অবস্থান গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, “আমরা সংবিধান মেনেই এ পর্যন্ত এসেছি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হতে হলে আগে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে সংবিধানে এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
বিএনপির এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে। তাদের মতে, বিএনপি সরাসরি সংস্কারের বিরোধী না হলেও তারা চায় এই সংস্কার প্রক্রিয়া যেন একটি আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়, যাতে ভবিষ্যতে এর বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান পরিবর্তন ও দ্বৈত শপথ
সকালে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, বিএনপি সংস্কার পরিষদের শপথ না নিলে তারাও তা বর্জন করতে পারে। দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে তারা ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দুপুর গড়াতেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ১২টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ—উভয় পদেই শপথ গ্রহণ করেন। জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে বেশ চমক সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, রাজপথের অন্যতম শক্তি হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর ৬ জন সদস্যও দুপুর ১টায় দ্বৈত শপথ গ্রহণ করেন। শুরুতে তারা কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংস্কার প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার পথই বেছে নেন। এনসিপি মনে করছে, সংসদের ভেতরে থেকে সংবিধান পুনর্লিখনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ঘিরে বিতর্কের নেপথ্যে
এবারের সংসদ নির্বাচনে গণভোটের মাধ্যমে ‘জুলাই চার্টার’ অনুযায়ী একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পরিষদের কাজ হবে পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার সাধন করা। তবে এই পরিষদকে সংসদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বা এর শপথ নেওয়ার আইনি কাঠামো এখনো সংবিধানের ৩য় তফসিলে যুক্ত হয়নি। বিএনপির আপত্তির প্রধান জায়গাটি এখানেই। তারা মনে করছে, আইনি ভিত্তি ছাড়া এই পরিষদের শপথ নেওয়া হবে সাংবিধানিক অসংগতি।
বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টি: আগামী দিনের সংসদীয় রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শপথের প্রথম দিনেই সংসদে ক্ষমতার তিনটি প্রধান ধারার মধ্যে এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা’ ফুটে উঠেছে। বিএনপি যেখানে ‘আইনি প্রক্রিয়া’ এবং ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে জামায়াত ও এনসিপি ‘বিপ্লবী চেতনা’ ও ‘দ্রুত সংস্কার’কে প্রাধান্য দিচ্ছে।
এই মতপার্থক্য আগামী দিনের সংসদীয় কার্যক্রমে বড় ধরনের উত্তাপ ছড়াতে পারে। বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের কার্যক্রমে সরাসরি অংশ না নেয়, তবে সংস্কারের পুরো কৃতিত্ব বা দায়ভার চলে যেতে পারে জামায়াত ও এনসিপির হাতে। আবার বিএনপি ছাড়া যেকোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন টেকসই হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়। সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু হলো এক দিকে আশার আলো নিয়ে, অন্য দিকে গভীর এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জটিল সমীকরণকে সঙ্গী করে। রাষ্ট্র সংস্কারের এই মহাযজ্ঞে শেষ পর্যন্ত কে কতটা ছাড় দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।