ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ষড়যন্ত্রের গণভোট প্রতিহতের আহ্বান জিএম কাদেরের

ষড়যন্ত্রের গণভোট প্রতিহতের আহ্বান জিএম কাদেরের

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের আসন্ন গণভোটকে একটি গভীর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করে এটি দেশজুড়ে বানচাল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই গণভোটে হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়, তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং দেশ এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। বৃহস্পতিবার রাতে রংপুর নগরীর দর্শনা এলাকায় অবস্থিত পল্লীনিবাসে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর প্রাক্কালে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

জিএম কাদের অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার ও তাদের নেপথ্যের কুশীলবরা প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে জনগণের প্রকৃত মতামতের তোয়াক্কা না করেই হ্যাঁ ভোটকে বিজয়ী করতে চাইছে। তার মতে, এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন বা সংস্কার প্রক্রিয়া নয়, বরং এর আড়ালে তথাকথিত বিপ্লবী সরকার গঠনের একটি নীলনকশা সাজানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গণভোটে যদি সরকার জয়লাভ করে, তবে ভবিষ্যতে গঠিত যেকোনো সরকারকে একটি বিশেষ মহলের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে এবং দেশের প্রকৃত ক্ষমতা জনগণের প্রতিনিধিদের হাত থেকে অন্যদের হাতে চলে যাবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনও এই পরিস্থিতির গভীরতা ও ভয়াবহতা বুঝতে পারছে না, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনি সংকেত।

সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় পার্টির অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জিএম কাদের বলেন, তারা কখনোই সংস্কারের বিপক্ষে ছিলেন না। তবে সেই সংস্কার অবশ্যই জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হতে হবে। তিনি বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই গণঅভ্যুত্থানকে একটি বিশেষ পরিকল্পনা বা মেটিকুলাস ডিজাইন হিসেবে বর্ণনা করেছে। তার অভিযোগ, সরকারের নিয়োগদাতা ও অভিভাবকদের সঙ্গে বিশেষ কিছু সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর একটি অঙ্গসংগঠনসহ কয়েকটি দল মিলে বর্তমানে কার্যত সরকারি দল হিসেবে কাজ করছে। এই আঁতাতের মাধ্যমেই দেশে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি তার চাকরি জীবন এবং মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে অসংখ্য সংস্কারমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে তিনি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় সংস্কারক হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তার ভেতরে তিনি কেবল ষড়যন্ত্রই দেখতে পাচ্ছেন। তার মতে, সাধারণ মানুষের ওপর বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে এবং অবাস্তব লোভ দেখিয়ে গণভোটের মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জনগণকে বোঝানো হচ্ছে যে হ্যাঁ ভোট দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, যা প্রকৃতপক্ষে একটি বড় ধরণের ধোঁকা।

জিএম কাদের আরও বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এখনও পুরো বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে না। একটি বিশেষ পক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে তথ্য গোপন করছে এবং একতরফা প্রচারণার মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই গণভোট সফল হলে দেশের সংসদীয় ব্যবস্থা বা গণতান্ত্রিক কাঠামোর যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা প্রতিহত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। রংপুর-৩ আসনের ভোটারদের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের প্রতি তিনি এই বিষয়ে সজাগ থাকার এবং যেকোনো অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

বিপুলি সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে এরশাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং মোনাজাতের পর জিএম কাদের তার নির্বাচনি প্রচারণার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিবেশেও জাতীয় পার্টি জনগণের পাশে থাকবে এবং যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে জাতীয় পার্টির এই অবস্থান অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যকারিতা এবং আসন্ন গণভোটের যৌক্তিকতা নিয়ে জিএম কাদেরের এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক মহলে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

জিএম কাদেরের এই কঠোর অবস্থান মূলত বর্তমান সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে একটি বড় ধরণের প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যখন একটি প্রধান রাজনৈতিক দল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে, তখন তা জাতীয় ঐকমত্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তনের যে আশঙ্কার কথা তিনি বলেছেন, তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। একই সাথে জামায়াত বা অন্যান্য শক্তির প্রভাব নিয়ে তার মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী নির্বাচন এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় দলগুলোর মধ্যে মেরুকরণ আরও তীব্র হবে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া যেকোনো মৌলিক পরিবর্তন যে শেষ পর্যন্ত বিতর্কের মুখে পড়ে, জিএম কাদেরের এই বক্তব্যটি তারই একটি প্রতিচ্ছবি।