দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম রোধ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং জবাবদিহিতা জোরদারের লক্ষ্যে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে থেকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোনোভাবেই পুনঃভর্তি ফি (Readmission Fee) আদায় করা যাবে না।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যা গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
নীতিমালার প্রধান দিকসমূহ
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) কেবল ‘টিউশন ফি নীতিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি গ্রহণ করতে পারবে। এর বাইরে নতুন কোনো খাত সৃষ্টি করে অর্থ আদায় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নীতিমালার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
যৌথ দায়বদ্ধতা: প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের জন্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান যৌথভাবে দায়ী থাকবেন। যেকোনো আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির জন্য প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং লেনদেন বাধ্যতামূলক: শিক্ষার্থীদের সব প্রকার ফি, অনুদান ও প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয় নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব অথবা সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে (SPG)-এর মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নগদ লেনদেনে সীমাবদ্ধতা: কেবল জরুরি প্রয়োজন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে নগদ অর্থ গ্রহণ করা যাবে। তবে সেই অর্থ পরবর্তী দুই কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে।
হিসাব সংরক্ষণ: পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) কর্তৃক নির্ধারিত ক্যাশবইয়ে (Cash Book) সব হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। আয়-ব্যয়ের খাতে কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করতে হলে অবশ্যই মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
কতটুকু কার্যকর হবে এই নীতিমালা?
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিমালা দেশের শিক্ষাখাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী:
১. অভিভাবকদের স্বস্তি: প্রতি বছর সেশন চার্জ বা পুনঃভর্তি ফির নামে যে বিশাল অঙ্কের টাকা অভিভাবকদের গুণতে হতো, তা বন্ধ হওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে।
২. ডিজিটালাইজেশনের সুফল: পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় ক্যাশ টেবিলের অস্বচ্ছ লেনদেন বন্ধ হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় গোপন করার সুযোগ থাকবে না।
৩. তদারকির অভাব: নীতিমালা কাগজে-কলমে চমৎকার হলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রতিষ্ঠান 'উন্নয়ন ফি' বা 'বিবিধ' খাতের আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে।
৪. বেসরকারি খাতের প্রতিক্রিয়া: অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাবি করছে যে, পুনঃভর্তি ফি বন্ধ হলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকার যদি টিউশন ফির একটি যৌক্তিক কাঠামো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করে, তবে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরিশেষে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সাহসী উদ্যোগ তখনই সফল হবে যখন কঠোর মনিটরিং এবং অভিযোগ বক্সের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা যাবে। অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই নীতিমালা কেবল একটি দাপ্তরিক আদেশ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।