আজ আবারও একটি রাজনৈতিক প্রতীকী দিনের সাক্ষী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্ব গ্রহণ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এক যুগান্তকারী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রকাশ। যার সূত্রপাত ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও ক্ষমতার রূপান্তর প্রক্রিয়ায়। দীর্ঘ একদলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, দমন-নিপীড়ন ও আস্থাহীন নির্বাচনের অভিযোগের পরে যে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, তার পরিণতিতে রাষ্ট্র এখন এক নতুন পরীক্ষাগারের সামনে দাঁড়িয়ে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন মূলত একটি ভোটাধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও দ্রুত তা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে পরিণত হয়। রাজপথে যে স্লোগান উঠেছিল—“নির্বাচন নয়, প্রতিনিধিত্ব চাই” তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এক ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। সেই চাপের মধ্যেই অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, তা অন্তত একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জনগণ আবার ভোটকে অর্থবহ বলে ভাবতে শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নবনির্বাচিত সংসদের শপথের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। গত এক দশকে সংসদ কার্যত বিরোধী কণ্ঠহীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী দল বর্জিত অধিবেশন, অনির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের অভিযোগ, এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ফলে সংসদ জনগণের নীতিনির্ধারণী মঞ্চের বদলে প্রশাসনিক অনুমোদনের স্থানে রূপ নেয়। এবার সেই জায়গায় অন্তত সংখ্যাগত ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্য ফিরে আসছে। সংসদের ভেতরে মতভেদ, বিতর্ক এবং প্রশ্নোত্তরের সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার হতে পারে—যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
নতুন মন্ত্রিসভার শপথও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সরকার কেবল নির্বাচনী বিজয়ের সরকার নয়, এটি প্রত্যাশার সরকার। জনগণের প্রত্যাশা তিনটি বিষয়ে স্পষ্ট (১) বিচার ও জবাবদিহি (২) অর্থনৈতিক স্থিতি (৩) প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। গত কয়েক বছরে অর্থনীতি যে চাপের মধ্যে পড়েছে মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণ খেলাপি এসব প্রশ্নের দ্রুত সমাধান না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ফলে নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষা হবে অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন।
আরও বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসনিক সংস্কার। আন্দোলনের সময় জনগণের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্র কেবল কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। তাই মন্ত্রিসভার শপথের সঙ্গে সঙ্গে জনগণ আসলে একটি প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়: রাষ্ট্র- দল নয়, নাগরিকের হবে।
এই সংসদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জাতীয় পুনর্মিলন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বারবার দুর্বল করেছে। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সময়ের বিচারকে প্রায়ই প্রতিশোধে রূপ দিয়েছে। যদি এই চক্র অব্যাহত থাকে, তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশা আবারও হতাশায় রূপ নেবে। বরং একটি সত্য-উন্মোচন, আইনি জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সহনশীলতার কাঠামো তৈরি করতে পারলে তা হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শপথ অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে বিদেশি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক আস্থাও বাড়বে। অর্থাৎ এই সংসদ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও ভিত্তি।
সবশেষে বলা যায়, শপথ একটি সমাপ্তি নয় একটি শুরু। ২০২৪ সালের আন্দোলন রাষ্ট্রকে একটি সুযোগ দিয়েছে কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে এই সংসদের কার্যকারিতা এবং মন্ত্রিসভার নীতিগত সততার ওপর। গণতন্ত্র কেবল ভোটে জন্মায় না, আচরণে টিকে থাকে। যদি সংসদ বিতর্কের স্থান হয়, সরকার জবাবদিহির প্রতীক হয় এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে। তবেই এই দিনটি ইতিহাসে একটি সত্যিকারের মোড় পরিবর্তনের দিন হিসেবে স্মরণীয় হবে।অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে।