বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পারেন। তবে প্রয়োজন হলে এ ঘোষণা এক দিন পিছিয়েও যেতে পারে। তাঁর পদত্যাগ দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা করবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স দুটি পৃথক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেছেন। আরেকটি সূত্রের দাবি, গত মঙ্গলবারই তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। যদিও বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করলেও তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরছেন বলে জানা গেছে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তাঁর উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, পদত্যাগের পর তিনি রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে অবস্থান করবেন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোঃ সাহাবুদ্দিন। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে স্বাস্থ্যগত কারণেই তিনি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাধ্যতামূলক।
এই পদত্যাগের ফলে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ভোট এবং সংসদের উভয় কক্ষের অংশগ্রহণের প্রস্তাব থাকলেও তা এখনও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের দায়িত্বকাল ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্থির সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথবাক্য পাঠ করান। একই বছরের অক্টোবরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর দেওয়া মন্তব্য দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের আমলেও তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত ছিল।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে পদত্যাগে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি ব্যক্তিগত বা স্বাস্থ্যগত কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চান, তাহলে তা সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কোনো ইঙ্গিত নয়; বরং এটি সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটি আরেকটি সাংবিধানিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।