ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা অবরুদ্ধ: বাতিল শত শত ফ্লাইট, দিশেহারা ওমরাহযাত্রী ও প্রবাসীরা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা অবরুদ্ধ: বাতিল শত শত ফ্লাইট, দিশেহারা ওমরাহযাত্রী ও প্রবাসীরা

ইরানের মাটিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তার চরম ঝুঁকিতে ইরান, ইরাক, জর্ডান, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এশিয় ও ইউরোপীয় কয়েক ডজন বিমান সংস্থা তাদের শত শত ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

দুবাইসহ প্রধান বিমানবন্দরগুলো অচল

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ট্রানজিট পয়েন্ট দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটের সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। দুবাই মিডিয়া অফিস এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল এবং আল মক্তুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও কোনো উড্ডয়ন বা অবতরণ ঘটবে না। একইভাবে কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতগামী ফ্লাইটগুলো মাঝ আকাশ থেকে ফিরে গেছে অথবা বিকল্প পথে যাত্রা করেছে।

এখন পর্যন্ত এয়ার ফ্রান্স, লুফথানসা, কাতার এয়ারওয়েজ, এয়ার ইন্ডিয়া, টার্কিশ এয়ারলাইনস এবং এমিরেটসের মতো জায়ান্টরা তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যাত্রীদের টিকিটের টাকা রিফান্ড বা বিকল্প তারিখের প্রস্তাব দিচ্ছে বিমান সংস্থাগুলো।

সংকটে ওমরাহযাত্রী ও প্রবাসী কর্মীরা

সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত হাজার হাজার বাংলাদেশি ওমরাহযাত্রী। নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট না চলায় মক্কা ও মদিনার হোটেল থেকে চেক-আউট করা যাত্রীরা এখন লবি বা করিডোরে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অর্থ ফুরিয়ে আসছে এবং শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

একই দৃশ্য ঢাকাতেও। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক শ যাত্রী আটকা পড়েছেন। বিশেষ করে ১ মার্চ কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল এমন শত শত প্রবাসী কর্মী এখন দিশেহারা। ওমরাহ পালনে যাওয়ার কথা ছিল এমন যাত্রীরাও অনিশ্চয়তায় দিন গুনছেন।

বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ ও দূতাবাসের সতর্কতা

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ শাহজালাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছেন। মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, আটকে পড়া যাত্রীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যেসব যাত্রীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ রাত্রিযাপনের সুবিধা দেওয়া হবে। এজন্য বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক বা লাউঞ্জে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বাহরাইন ও ইরাকে প্রবাসীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করেছে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো।

বাহরাইন: বাংলাদেশ দূতাবাস মানামা প্রবাসীদের অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনের জন্য নগদ অর্থ, সিপিআর কার্ড এবং শুকনো খাবার মজুত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরাক: ইরাকে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সামরিক স্থাপনার আশপাশ থেকে দূরে থাকার এবং নিজ নিজ আবাসে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সতর্কতা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, দাম্মাম, জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, শারজাহ, আবুধাবি, কুয়েত ও দুবাইগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছে যে, বিমানের হটলাইন নম্বর ১৩৬৩৬-এ যোগাযোগ করে পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কেউ যেন বিমানবন্দরে ভিড় না করেন।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আকাশসীমা বন্ধ হওয়া কেবল বিমান চলাচলেই প্রভাব ফেলবে না, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) এবং জ্বালানি তেলের দামেও বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। আকাশপথ কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে তা নির্ভর করছে তেহরান ও তেল আবিবের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ওপর।