দীর্ঘ দেড় দশকের একতরফা রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে এক নতুন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ বিহীন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন রাজপথ ও ভোটের ময়দান দুই-ই বিরোধী শিবিরের দখলে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ২০০৯ সালের পর দেশের প্রথম ‘সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ নির্বাচন হিসেবে দেখছেন সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। ফলে দীর্ঘদিনের ‘নৌকা’র আধিপত্যের বদলে এখন রাজপথজুড়ে শোভা পাচ্ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানার। মাইকে বাজছে প্রচারসংগীত, যা এক সময় ছিল অকল্পনীয়।
জয়ের পাল্লা ও তরুণদের ভূমিকা
জনমত জরিপগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অনেকটা এগিয়ে থাকলেও লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দেশের ২৯২টি আসনে প্রার্থী দেওয়া বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন অর্জনে সক্ষম হবেন।
তবে এবারের নির্বাচনে বড় ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জেন-জি বা তরুণ ভোটাররা, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা এই তরুণদের একাংশ জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষক পারভেজ করিম আব্বাসি মনে করেন, এখনো বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেননি, যাদের ভোটই শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
১৭৫ মিলিয়ন মানুষের এই দেশটি বর্তমানে চরম উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে জর্জরিত। ভোটারদের কাছে এবার ধর্মের চেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতি দমন। তৈরি পোশাক খাতের অস্থিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা হবে নতুন সরকারের জন্য পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ।
আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এই নির্বাচনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শেখ হাসিনার পতনের পর দিল্লির প্রভাব কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ভারতের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা বললেও জামায়াত জোটের বিজয়ে চীনের প্রভাব এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের এক পরীক্ষা। ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পাওয়ার যে আনন্দ, তার সাথে যুক্ত হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ১২৮ মিলিয়ন ভোটারের প্রধান উদ্বেগ এখন মূল্যস্ফীতি ও সুশাসন। তরুণ ভোটারদের যে অংশটি শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে, তারা কোনো গতানুগতিক সরকার নয়, বরং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার অপেক্ষায় রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির চেষ্টা এবং বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি—এই দুইয়ের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর। তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী সরকারের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রিজার্ভ সংকট সামাল দেওয়া হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকা বাংলাদেশের এই নির্বাচন তাই শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে।