ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:১০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভোটের আগে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ: সিইসির দ্বারস্থ বিএনপি

ভোটের আগে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ: সিইসির দ্বারস্থ বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মহারণ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে নতুন এক বিতর্ক। নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে বিএনপি। এই বৈঠকে দলটি জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নির্বাচনি ময়দানে অবৈধভাবে টাকা ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এই সাক্ষাৎ করেন। তারা দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জনমতকে প্রভাবিত করতে বিশাল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।

বৈঠক শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে নজরুল ইসলাম খান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তার দলের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু বড় ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে যা শুধু বিএনপির জন্য নয়, বরং গোটা দেশের সাধারণ মানুষের কাছেই অত্যন্ত অপছন্দনীয়। নির্বাচনের আগের রাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এর বিচার হওয়া প্রয়োজন।” তার বক্তব্যে উঠে আসে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যেখানে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। বিএনপি নেতার দাবি, এই ঘটনার সময়কাল এবং পরিস্থিতি পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

নজরুল ইসলাম খান আরও অভিযোগ করেন যে, ফেনী-১ আসনসহ ময়মনসিংহ, রামু, বগুড়ার কাহালু ও লক্ষ্মীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে জামায়াত নেতাদের বেআইনি কার্যক্রম এবং অর্থ বিতরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি জানান, তারা কেবল মৌখিক অভিযোগই করেননি, বরং এর সপক্ষে সংগৃহীত বিভিন্ন সংবাদ ক্লিপিং এবং ভিডিও ফুটেজও নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। বিএনপি এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে করে ভোটারদের প্রভাবিত করার এই অপচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা যায়।

বৈঠকে আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিবের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে অসন্তোষ। নজরুল ইসলাম খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সৈয়দপুরে টাকাসহ আটকের ঘটনায় ইসি সচিবের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যাখ্যা এসেছে তা অগ্রহণযোগ্য। যেখানে ভোটের পরিবেশ ঠিক রাখতে বিকাশে ১০ হাজার টাকার বেশি লেনদেনে সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কয়েক কোটি টাকা বহনকে স্বাভাবিক বলার কোনো সুযোগ নেই।” এছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাস্টমস অনুমতির বিষয়ে দেওয়া আগাম ব্যাখ্যাকেও বিএনপি সন্দেহজনক বলে মনে করছে। তাদের মতে, কোনো প্রশ্ন ওঠার আগেই কেন এই কৈফিয়ত দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দুই মিত্র রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এমন বিপরীতমুখী অবস্থান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যৎ সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির এই প্রকাশ্য অভিযোগ কেবল টাকা ছড়ানোর বিষয় নয়, বরং এটি ভোটের মাঠে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার একটি মনস্তাত্ত্বিক লড়াইও হতে পারে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে এমন ফাটল ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। যদি এই অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তা কেবল নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়, বরং সাধারণ মানুষের ভোটের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটাররা এই পরিস্থিতিকে কীভাবে নেয় এবং নির্বাচন কমিশন কতটুকু কঠোর হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভাগ্য।