ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ

ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ

মিয়ানমারে সৃষ্ট একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ৫১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.১, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া না গেলেও আতঙ্কে রাজধানীর বহুতল ভবনগুলো থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও প্রযুক্তিগত তথ্য

ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (EMSC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল মিয়ানমারের সাগাইং (Sagaing) অঞ্চলের মনিওয়া শহর থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং মাওলাইক শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে:

অবস্থান: ২৩.০৪১১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৪.৭২৬৮ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

গভীরতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০১ কিলোমিটার গভীরে এর উৎপত্তি হয়েছে।

সময়: বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৫১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড।

ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে (১০১ কিমি) উৎপত্তি হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা দীর্ঘস্থায়ী হলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলক কম হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনমনে আতঙ্ক ও মাঠপর্যায়ের চিত্র

রাজধানীর ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর এবং বনানী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে ঘরবাড়ি দুলতে শুরু করলে মানুষ ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। বিশেষ করে বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছিল সবচেয়ে বেশি। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট এবং দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সাভারের এক বাসিন্দা জানান, "রাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, হঠাৎ খাটসহ পুরো ঘর কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুলে ওঠে। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত বাচ্চাদের নিয়ে নিচে নেমে আসি।"

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি

বুধবার রাতের এই ভূমিকম্পটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এই ভূমিকম্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে:

১. টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয়তা: মিয়ানমারের সাগাইং ফল্ট লাইনটি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সক্রিয়। এই ফল্ট লাইনটি বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম সীমান্তের খুব কাছাকাছি। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে ৫ মাত্রার আশেপাশে বেশ কিছু ভূমিকম্প হয়েছে, যা বড় ধরনের কোনো ‘মেগাথ্রাস্ট’ ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ কি না, তা নিয়ে ভূ-তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

২. গভীরতা ও প্রভাব: ভূমিকম্পটির গভীরতা ১০১ কিলোমিটার হওয়ায় এটি সরাসরি বিধ্বংসী রূপ নেয়নি। সাধারণত ভূপৃষ্ঠের ২০-৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ৫ মাত্রা বা তার বেশি ভূমিকম্প হলে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে গভীর স্তরে কম্পন হওয়ার অর্থ হলো ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের মধ্যে প্রবল চাপ তৈরি হচ্ছে।

৩. শহরাঞ্চলের প্রস্তুতি: রাজধানী ঢাকার ভবনগুলোর নির্মাণশৈলী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ৫.১ মাত্রার এই মাঝারি কম্পনেই যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তাতে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে বারবারই ‘আর্থকোয়াক ড্রিল’ বা মহড়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

৪. সতর্কবার্তা: বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের আগে অনেক সময় ছোট বা মাঝারি ধরনের কম্পন (Foreshocks) হয়। তাই মিয়ানমার সীমান্ত বা হিমালয় পাদদেশীয় অঞ্চলে এই ঘনঘন কম্পনগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।