ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ব্যালট ও বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: নতুন ভোরের প্রতীক্ষায় ১২ ফেব্রুয়ারি

ব্যালট ও বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: নতুন ভোরের প্রতীক্ষায় ১২ ফেব্রুয়ারি

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যা গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটার এই দিন ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। একই দিনে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে 'জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫'-এর ওপর গণভোট, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ এবং একই সাথে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এক অনন্য সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে মূল লড়াই হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে।

বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া চলছে, আর তার দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই শূন্যতায় রাজনীতির ময়দান এখন পুরোপুরি বিএনপি ও জামায়াতের দখলে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন নিজেদের উদার ও গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান দলের হাল ধরেছেন। তার প্রত্যাবর্তনে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তিনি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, আইটি শিক্ষা এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। জনমত জরিপ বলছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে বিএনপি এই মুহূর্তে এককভাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও এবার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত একটি ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গঠিত 'ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি' (এনসিপি)। জামায়াত এবার তাদের ভাবমূর্তি সংস্কারে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে; প্রথমবারের মতো তারা খুলনার একটি আসনে কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াত নেতারা বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন যে, তাদের ক্ষমতায় সংখ্যালঘু ও নারীদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। জরিপ অনুযায়ী, জামায়াত জোট ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপির খুব কাছে অবস্থান করছে। তবে এনসিপির মতো ছাত্র-সংগঠন থেকে আসা দলের সাথে জামায়াতের জোট গঠন নিয়ে তরুণ সমাজের একটি অংশে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে এনসিপিতে কিছু অভ্যন্তরীণ ভাঙনও দেখা গেছে।

এই নির্বাচনের ভাগ্য শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নয়, বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কারে 'জুলাই সনদ' কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর। এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও বিএনপি এই সনদের কিছু ধারা, বিশেষ করে 'প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন' বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তবুও গণভোটের মাধ্যমে এর চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। এদিকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট করেছেন যে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে মোতায়েন থাকবে। সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই মহালগ্ন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভোট নয়, বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনাবিন্দু হিসেবেই দেখছে সাধারণ মানুষ।

তথ্যসূত্র:আল জাজিরা