ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বার ২০২৫, ০৮:২১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে কঠোরতা: বাংলাদেশিদের ভিসা–সংকট এখন ‘অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা’র মতো

বিশ্বজুড়ে কঠোরতা: বাংলাদেশিদের ভিসা–সংকট এখন ‘অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা’র মতো

বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কাজের সুযোগ পেতে বাংলাদেশিদের ভিসাজট এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই স্কলারশিপ পাওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে যেতে পারছেন না কেবল ভিসা জটিলতার কারণে। তানজুমান আলম ঝুমা তাদের একজন। তিনি এক বছরেরও বেশি সময় হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার চেষ্টা করেও ভিসা না পাওয়ায় কোনো দেশেই আর যেতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পুরো সময়টাই ভিসা প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়েছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য।

শিক্ষার্থী ভিসা ছাড়াও নানা ধরনের শ্রমিক ভিসা, ভ্রমণ ভিসা কিংবা আগের মতো সহজে পাওয়া যাওয়ার কথা থাকা অনেক ভিসাই এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। এমনকি ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো, যেগুলো এতদিন তুলনামূলক সহজে ভিসা দিত, সেখানেও আটকে যাচ্ছে আবেদন। অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশিদের ওপর কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নেই ভারতীয় পর্যটন ভিসা ছাড়া।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, একাধিক দেশ এখন নানা অজুহাতে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিচ্ছে না। টোয়াবের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামানের মতে, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম—এসব দেশের ভিসা কার্যত বন্ধ বলা যায়। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার ভিসা প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় ধীরগতির। ফিলিপাইন সময় নিচ্ছে দীর্ঘদিন, ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি বেড়েছে, আর শ্রীলঙ্কার ই–ভিসা পেতেও এখন কয়েক দিন লেগে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতায় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত বাংলাদেশের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। যদিও এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা করা হলেও, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বহু দেশ থেকেও এখন ভিসা পাওয়া কঠিন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। পর্যটন উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বাংলাদেশিদের জন্য বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভিসা প্রদান করলেও এ বছর সেই সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৩–২৪ সালে যেসব দেশ বেশ উদারভাবে ভিসা দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা—এই বছর তারা খুব সীমিত সংখ্যক আবেদনই গ্রহণ করছে।

ভিসা জটিলতার পেছনে শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই দায়ী করা হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়মিত পথে বিদেশে ঢোকার প্রবণতা অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে। কেউ কেউ তুলনামূলক সহজ দেশের ভ্রমণ ভিসা নিয়ে সেখানকার রুট ধরে অন্য দেশে পৌঁছে যাচ্ছে, যা বহু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার নজরে এসেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ভ্রমণ ভিসার সুবিধা ব্যবহার করে অনেকেই অনিয়মিতভাবে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন, যার কারণে ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোরতা বাড়ছে। এমনকি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভ্রমণ ভিসায় লোক পাঠিয়ে পরে শ্রমিক ভিসায় রূপান্তর করার মতো প্রতারণা করছেন—এই অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশিদের মধ্যে কিছু মানুষের বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক বিবাদে জড়িয়ে পড়াও দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাসপোর্ট র‍্যাংকিংয়ের দুর্বল অবস্থা। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল পাসপোর্টের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বাংলাদেশের নাগরিকরা মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া বা অন–অ্যারাইভাল সুবিধায় যেতে পারেন, যেগুলোর বেশিরভাগই আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের—এবং এসব দেশে ভ্রমণের প্রবণতা কম।

গত বছর ভারতের ভিসা সীমিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে দিল্লি ছাড়াও অন্য দেশে ভিসা প্রক্রিয়া স্থানান্তরের অনুরোধ করে। কয়েক মাস পর ঢাকা থেকেই নয়টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হলেও ভিসার জটিলতা কাটেনি। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের অনিয়ম ও অসদাচরণের কারণেই বহু দেশ এখন ভিসা প্রদান বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সরকারকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা ভিসার অপব্যবহার করছে বা অসৎ উপায়ে বিদেশে মানুষের যাতায়াত পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা ফেরানো সম্ভব। পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে সংলাপ বাড়ানোই এখন জরুরি। তাঁদের মতে, দেশের ভেতর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃশ্যমান প্রমাণ দিলে ভিসা–সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা