ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৮:৫১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বিদায় ‘আপসহীন নেত্রী’: বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি

বিদায় ‘আপসহীন নেত্রী’: বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার সাথে লড়াই করে আজ ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চার দশকের এক অবিস্মরণীয় ও দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

শৈশবের ‘পুতুল’ থেকে জাতীয় নেত্রী

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, এক অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই মহীয়সী নারী। তাঁর পিতা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি অত্যন্ত শান্ত ও সুন্দর ছিলেন বলে পরিবারে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। তবে পারিবারিক চিকিৎসক তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘শান্তি’। বড় বোন চকলেট ডাকতেন ‘টিপসি’ বলে।

শৈশবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ছিমছাম ও পরিপাটি। মাছ খেতে পছন্দ করতেন না বলে মা তৈয়বা মজুমদার আলু ও ঢেঁড়শ দিয়ে মাংস রান্না করে দিতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ ও গানের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও জিতেছিলেন।

জীবন বদলে দেওয়া সেই ৩০ মে

১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিজেকে একজন আদর্শ গৃহবধূ হিসেবেই গুছিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে স্বামীর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া—সবকিছুর আড়ালে থেকে তিনি পরিবার সামলেছেন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর পাল্টে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ।

দলের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং কর্মীদের প্রবল দাবির মুখে ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে ৪১ বছর ধরে তিনি দলটির অবিসংবাদিত কান্ডারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আপসহীন নেত্রী ও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

আশির দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে তাঁর আপসহীন সংগ্রাম তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে অনড় অবস্থান নেন, যা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব এনে দেয়।

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং পরবর্তীতে ২০০১ থেকে ২০০৬—এই দুই পূর্ণ মেয়াদে তাঁর শাসনামলে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উদারীকরণের মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালে তাঁর সরকারের অধীনে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছুঁয়েছিল, যা দেখে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘এমার্জিং টাইগার’ হিসেবে অভিহিত করে।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও কঠিন পরীক্ষা

রাজনীতির ময়দানে সফল হলেও বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অনেক বেদনাময়। ২০০৮ সাল থেকে বড় ছেলে তারেক রহমান নির্বাসিত। ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে তিনি স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ২০১০ সালে সেনানিবাসের দীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়।

২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত মামলায় কারাবন্দি হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। দীর্ঘ সময় নির্জন কারাবাস এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তাঁর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি কখনও দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। ১/১১-এর সময় তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি—“বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমি মরতে চাই”—এখনও দেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

শেষ দিনগুলো ও অন্তিম বিদায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি কারামুক্তি পান। ২০২৫ সালের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ১১৭ দিন চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে শরীর আর সায় দিচ্ছিল না।

আজ ভোর ৬টায় তাঁর মহাপ্রয়াণে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীক। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যতবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, কোনো আসনেই কখনো পরাজিত হননি—এটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য রেকর্ড।

উপসংহার

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর ৪১ বছরের নেতৃত্ব, গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের আখ্যান আগামী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে। ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে খ্যাত এই নেত্রীর বিদায় মানে একটি যুগের অবসান।