ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় সাংবিধানিক পরিবর্তন: আপিল বিভাগের রায়ে ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় সাংবিধানিক পরিবর্তন: আপিল বিভাগের রায়ে ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান কার্যকর হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল খারিজ করে দেন। রায় ঘোষণার পর মামলার আইনজীবীরা বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এই রায়ের মাধ্যমে বহাল থাকল গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর দেওয়া হাইকোর্টের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। সে রায়ে আদালত বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার জন্য পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান বাতিলকারী ৪৭ ধারাও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। ফলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়।

তবে আদালত পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল করেননি। রায়ে বলা হয়েছে, সংশোধনীর অন্যান্য বিধান বহাল থাকবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ প্রয়োজনে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সেগুলো সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।

হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ছাড়া সেই গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদালত এ প্রেক্ষাপটকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

রায়ে আরও বলা হয়, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংবিধানে যুক্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে সেটি বাতিল করা সংবিধানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এ ছাড়া সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের মতে, এসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়, যখন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে রিট আবেদন করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণফোরামসহ একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ মামলায় ইন্টারভেনর হিসেবে যুক্ত হয়।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। একই সংশোধনীতে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০-এ উন্নীত করা এবং সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

আপিল বিভাগের সর্বশেষ এই রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ এবং পরবর্তী সাংবিধানিক ও আইনগত পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ।