এক দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা ও গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদের শপথ এবং পরে গোপনীয়তার শপথ গ্রহণ করেন তিনি। শপথ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
ঐতিহ্যগতভাবে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হলেও, এবার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপির সিদ্ধান্তে সংসদ ভবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদেরও শপথ পাঠ করান। আজ সন্ধ্যা নাগাদ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার নেপথ্যে
বিকেলে শপথের আগে, সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল পৌনে ১১টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে সদস্যদের শপথ পড়ান। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংসদীয় দলের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। দলের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, উক্ত বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়, যা তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম করে।
এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
তারেক রহমানের এই শপথ গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল একটি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ক্ষমতার এককেন্দ্রিক শাসনের অবসানের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদ ভবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন মূলত 'জনগণের সংসদ' এবং 'স্বচ্ছ জবাবদিহিতা'র একটি বার্তা দেওয়ার প্রয়াস। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্র মেরামতের '৩১ দফা' বাস্তবায়ন করা।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে প্রধান পরীক্ষা হবে ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করা এবং বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো শক্তিগুলোর সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর মূল চ্যালেঞ্জ। রাজপথের আন্দোলনের পর ব্যালটের মাধ্যমে আসা এই ম্যান্ডেটকে টেকসই করতে হলে নতুন সরকারকে প্রতিহিংসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে হবে। আজকের এই শপথ অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনাবিন্দু হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।