ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জনগণের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ক্ষমতায় আসেনি: জামায়াত আমির

বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জনগণের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ক্ষমতায় আসেনি: জামায়াত আমির

সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জনগণের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ক্ষমতায় আসেনি। বরং ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল এবং ডিজিটাল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নিয়েছে তারা।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ভোটের ফলাফল ও ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ অভিযোগ

ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনের দিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের দলের এজেন্টদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে, কোথাও বা প্রশাসনিক কৌশলে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে। যারা আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট পাননি।”

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও দেশে এখনো ইসলামি আদর্শের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ এবার তরুণ প্রজন্ম একটি বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করা হয়েছে।

সংসদে যাওয়ার ব্যাখ্যা ও সরকারের প্রশংসা

কম আসন পাওয়া সত্ত্বেও কেন জামায়াত সংসদে যোগ দিয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে আমির বলেন, “জনগণের ভোটের যে সামান্য অংশের স্বীকৃতি মিলেছে, তার মর্যাদা রক্ষা করতেই আমরা সংসদে গেছি। সংসদে আমরা দলীয় নয়, বরং গণমানুষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার থাকব।”

তবে সরকারের কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্তের প্রশংসা করতেও ভোলেননি তিনি। বিশেষ করে এমপি-মন্ত্রীদের সরকারি প্লট ও করমুক্ত গাড়ি সুবিধা বর্জনের সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানান। এছাড়া প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার সিদ্ধান্তকে তিনি ‘মানবিক’ বলে অভিহিত করেন।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি

মিরপুর-কাফরুল এলাকার ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রমজান মাসে কোনো প্রকার চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না। কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে বা অন্য কোনো পরিচয়ে চাঁদা চায়, তবে তা দেবেন না। বাধা এলে সরাসরি দলকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, সুযোগ পেলে মাসে অন্তত একদিন তিনি সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হয়ে তাদের সমালোচনা ও পরামর্শ শুনবেন।

২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী জামায়াতের নতুন কৌশল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয়ের পর জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিচের বিষয়গুলো এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

১. ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বনাম ভোট ব্যাংক: জামায়াত দাবি করছে তারা জনসমর্থনে এগিয়ে ছিল, কিন্তু কারিগরি কারচুপিতে পিছিয়ে পড়েছে। এটি মূলত তাদের তৃণমূল কর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

২. দ্বিমুখী অবস্থান: একদিকে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, অন্যদিকে সরকারের জনবান্ধব কাজের প্রশংসা করা—এটি জামায়াতের এক ধরনের ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’। তারা সম্ভবত রাজপথের সংঘাতের চেয়ে সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চাইছে।

৩. তরুণ প্রজন্মের ফ্যাক্টর: ডা. শফিকুর রহমান বারবার তরুণ প্রজন্মের কথা বলছেন। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াত নিজেদের একটি আধুনিক ও সংস্কারপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা করছে, এই বক্তব্য তারই অংশ।

৪. বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের টানাপোড়েন: নির্বাচনের আগে ও পরে দুই দলের মধ্যে যে দূরত্বের গুঞ্জন ছিল, আমিরের এই ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পায়নি’ মন্তব্যটি সেই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করল। ভবিষ্যতে বিরোধী দলে জামায়াতের অবস্থান বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।