বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করল ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা। মঙ্গলবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি তরুণ ও টেকনোক্র্যাট মেধাবীদের সমন্বয় ঘটিয়ে এক বিশেষ চমক দিয়েছে বিএনপি।
মন্ত্রিসভার বিন্যাস ও তারুণ্যের উপস্থিতি
নতুন এই মন্ত্রিসভায় পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে ২৫ জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ২৪ জন শপথ নিয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজন যুক্ত হয়েছেন টেকনোক্র্যাট কোটায়। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন এবং শপথ নথিতে স্বাক্ষর করেন। দেশি-বিদেশি কয়েক’শ বিশিষ্ট অতিথির উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানটি এক অনন্য মর্যাদাপূর্ণ রূপ পায়।
কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে?
মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের হাতেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় দেখা গেছে:
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
সালাউদ্দিন আহমদ: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট): পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আ ম ন এহসানুল হক মিলন: শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মো. আসাদুজ্জামান: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
শেখ রবিউল আলম: সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।
এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে (বীর বিক্রম) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং আরিফুল হক চৌধুরীকে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (পানি সম্পদ) এবং জহির উদ্দিন স্বপন (তথ্য ও সম্প্রচার) গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর পেয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে চমক
প্রতিমন্ত্রীদের তালিকায় দেখা গেছে মাঠকাঁপানো একঝাঁক তরুণ মুখকে। ডাকসু ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের পাশাপাশি নুরুল হক নুর ও জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির মতো ভিন্ন মতাদর্শের নেতাদেরও সরকারে জায়গা দেওয়া হয়েছে, যা একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকারের ইঙ্গিত দেয়। ববি হাজ্জাজ, ইশরাক হোসেন এবং শামা ওবায়েদ ইসলামের মতো তরুণদের অন্তর্ভুক্তি তারেক রহমানের ‘তারুণ্যের শক্তি’ ব্যবহারের কৌশলেরই প্রতিফলন।
বিশ্লেষণাত্মক পর্যবেক্ষণ: দক্ষ ও পেশাদার সরকার গড়ার চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা মূলত একটি ‘ব্যালেন্সড’ বা ভারসাম্যপূর্ণ সরকার। অর্থ ও স্বরাষ্ট্রের মতো স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র ও আইনি ক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাট ও আইন বিশেষজ্ঞদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আস্থা ও বিচারিক সংস্কারের লক্ষ্যে। জুনায়েদ সাকি বা নুরুল হক নুরের মতো রাজপথের লড়াকু মুখদের সরকারে আনা মূলত জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ধারণ করার একটি প্রয়াস। তবে এই বিশাল মন্ত্রিসভার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করা এবং প্রশাসনের দলীয়করণমুক্তকরণ। জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে তারেক রহমানের এই ‘মাস্টার টিম’ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তাদের প্রথম ১০০ দিনের পারফরম্যান্সের ওপর।