ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:২৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

পাঁচ আসনে জয়, মন্ত্রিসভায় শূন্য: নোয়াখালীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘নীরব অস্বস্তি’

পাঁচ আসনে জয়, মন্ত্রিসভায় শূন্য: নোয়াখালীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘নীরব অস্বস্তি’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালীর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই নিরঙ্কুশ জয় এনে দিয়েও নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জেলার কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সংসদ ভবনে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের পর থেকেই এই জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ‘মূল্যায়নের’ বিষয়টি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও দলের কঠিন সময়ে ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই ফলাফল ম্লান করে দিয়েছে মন্ত্রিসভার তালিকায় জেলার নাম না থাকা।

ঐতিহ্যের দুর্গে প্রথমবার বঞ্চনার সুর

ঐতিহাসিকভাবে নোয়াখালীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই নোয়াখালী বিএনপিকে দুহাত ভরে আসন উপহার দিয়েছে। এমনকি ২০০৮ সালের বিপর্যয়ের মধ্যেও জেলাটি চারটি আসনে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। এবারের নির্বাচনে পাঁচটি আসনে ধানের শীষের জয় সেই ধারাকেই জোরালো করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো মন্ত্রিসভায় নোয়াখালীর প্রতিনিধিত্ব নেই, যা সাধারণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের ব্যথিত করেছে।

অভিজ্ঞতার ঝুলি বনাম প্রাপ্তির খতিয়ান

নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার মতো নোয়াখালীর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অভিজ্ঞতার পাল্লা ছিল বেশ ভারী। নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ছয়বারের এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক, পাঁচবারের এমপি বরকতউল্লা বুলু ও মো. শাহজাহান। এছাড়াও রয়েছেন অভিজ্ঞ আইনজীবী ও দ্বিতীয়বার নির্বাচিত এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, রাজপথের আন্দোলন এবং জাতীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাদের নাম আলোচনার শীর্ষে ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো হেভিওয়েট নেতাদের উপস্থিতি যে জাতীয় মর্যাদা এনে দিয়েছিল, এবার তার অনুপস্থিতি জেলাবাসীকে হতাশ করেছে।

তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও আবেগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সর্বত্রই এখন নোয়াখালী ইস্যুটি আলোচনার শীর্ষে। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খানসহ অনেক নেতাকর্মীই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়াকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ীদের মতে, নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন, সিটি করপোরেশন ও বিমানবন্দরসহ বড় প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে মন্ত্রিসভায় জেলার অভিভাবক থাকা জরুরি ছিল। যদিও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীর তৃণমূলের ক্ষোভের কথা স্বীকার করেছেন, তবে দলীয় শৃঙ্খলার খাতিরে কেউ কঠোর কোনো কর্মসূচি বা সংঘাতের দিকে যাচ্ছেন না।

কৌশলী সমীকরণের মারপ্যাঁচ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াখালীর এই অনুপস্থিতিকে কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি স্রেফ 'কৌশলগত ভারসাম্য' বা 'প্রশাসনিক বিন্যাসের' একটি অংশ হতে পারে। তারেক রহমানের নতুন সরকার সম্ভবত প্রথম ধাপে একটি ছোট ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মন্ত্রিসভা গঠন করতে চেয়েছে, যেখানে আঞ্চলিকতার চেয়ে বিশেষ বিশেষ খাতের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু নোয়াখালীর বিজয়ী পাঁচজনই দলের শীর্ষ ও পরীক্ষিত নেতা, তাই তাঁদের দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে বড় দায়িত্বে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

নোয়াখালীর এই অনুপস্থিতি মূলত কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস। একটি বড় অংশের বিশ্বাস, নিকট ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ানো হলে নোয়াখালীর জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ দায়িত্ব পাবেন। তবে আপাতত এই শূন্যতা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে—ভবিষ্যতে উন্নয়নের বরাদ্দ বা গুরুত্বপূর্ণ পদে জেলার নেতাদের সম্পৃক্ত করা না হলে তৃণমূলের এই প্রবল আকাঙ্ক্ষা হতাশায় রূপ নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বর্ধিত মন্ত্রিসভায় বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্য পদে এই অভিজ্ঞ নেতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়।