ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা ও বিএনপির ‘ছাড়’ দেওয়ার নীতিতে জামায়াতের গভীর উদ্বেগ

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা ও বিএনপির ‘ছাড়’ দেওয়ার নীতিতে জামায়াতের গভীর উদ্বেগ

নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার অপচেষ্টা এবং প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ জানান।

তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জনমনে ভীতি ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জামায়াত নেতার দাবি, এই তৎপরতার নেপথ্যে প্রশাসনের শিথিলতা এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ‘নরম সুর’ কাজ করছে।

বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে

জামায়াতের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, "আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ দল। তাদের কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ কোনো এখতিয়ার নেই। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, তারা বিভিন্ন স্থানে অফিস খোলার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। এটি জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং দেশবাসী আবারও অতীতের জুলুম-নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে।"

তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অপতৎপরতা বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত রহস্যজনক।

বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিবৃতিতে জামায়াত নেতা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কিছু নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মামলা থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।

জুবায়েরের মতে, "বিএনপির এই ধরনের ‘ছাড় দেওয়ার মানসিকতা’ এবং বিশেষ সুবিধার আশ্বাসের সুযোগ নিয়েই নিষিদ্ধ দলটি আবারও সক্রিয় হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এটি দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।"

জামায়াত-বিএনপি সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বর্তমান রাজনীতি

জামায়াতে ইসলামীর এই বিবৃতি কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির মেরুকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

১. আওয়ামী লীগ প্রশ্নে জিরো টলারেন্স বনাম রাজনৈতিক কৌশল: জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্নে ‘জিরো টলারেন্স’ বা আপোষহীন অবস্থানের কথা বলে আসছে। অন্যদিকে, বিএনপি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে। জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করছে যে, তারা রাজপথে আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার পুনরুত্থান সহ্য করবে না এবং এক্ষেত্রে তারা বিএনপিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে দ্বিধা করছে না।

২. মিত্রদের মধ্যে ফাটল না কি আদর্শিক লড়াই? বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কৌশলগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জামায়াত মনে করছে, আওয়ামী লীগকে আইনি বা রাজনৈতিকভাবে স্পেস দেওয়া হলে তা জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী হবে।

৩. প্রশাসনের ভূমিকা ও জননিরাপত্তা: নিষেধাজ্ঞার পর কোনো দলের অফিস খোলা বা মিছিল করা আইনিভাবে দণ্ডনীয়। জামায়াত নেতার এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জনমনে উদ্বেগ দূর করতে সরকারকে অবিলম্বে এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভবিষ্যৎ সতর্কবার্তা

বিবৃতির শেষে অ্যাডভোকেট জুবায়ের দেশবাসীকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সতর্ক, সজাগ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তিনি সরকারকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর হওয়ার এবং নিষিদ্ধ দলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজপথের রাজনীতিতে নতুন কোনো মোড় নিতে পারে, বিশেষ করে যদি আওয়ামী লীগের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ তৎপরতা বন্ধ না হয়।