আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের নেওয়া একটি ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তার হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকদের এক্রিডিটেশন কার্ড ও গাড়ির স্টিকার প্রদানের জন্য চালু করা অনলাইন পোর্টালে জমা দেওয়া প্রায় ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার নির্ধারিত ওয়েবসাইটে এই ভয়াবহ তথ্য ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এর ফলে সাংবাদিকদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যগুলো ইন্টারনেটে যে কেউ দেখার সুযোগ পেয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের একটি নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, যেখানে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ডের জন্য অনলাইনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ইসি নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাংবাদিকরা তাদের এনআইডি, ই-মেইল এবং ওটিপি যাচাইয়ের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করেছিলেন। তবে শুরু থেকেই সাংবাদিক সংগঠনগুলো এই পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও জটিলতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠক করে এবং এই পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানায়। সাংবাদিকদের আল্টিমেটামের মুখে কমিশন শেষ পর্যন্ত অনলাইন পদ্ধতি স্থগিত করে পুরনো কাগজে-কলমে আবেদনের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে শনিবার বিকেল ৪টার দিকে যখন অনলাইনে জমা পড়া সেই বিশাল তথ্যভাণ্ডার হঠাত করেই সর্বসাধারণের জন্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ওয়েবসাইটের হোম পেজে গেলেই কোনো প্রকার পাসওয়ার্ড বা লগইন ছাড়াই প্রতিটি আবেদনের বিস্তারিত তথ্য দেখার অপশন চলে আসে। এই ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, সাইটটি বন্ধ করার সময় যথাযথ নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়নি। ইসি সচিবালয়ের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, ওয়েবসাইটটি ডাউন করার সময় সম্ভবত কারিগরি জটিলতার কারণে কিছু সময়ের জন্য তথ্যগুলো উন্মুক্ত ছিল। তবে তিনি দাবি করেছেন যে সেখানে ডাউনলোডের কোনো সরাসরি ব্যবস্থা ছিল না।
পরবর্তীতে ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ওয়েবসাইটের অ্যাডমিনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কোনো এক পদক্ষেপের কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যদিও তথ্য ফাঁস হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ওয়েবসাইটটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার এমন চরম লঙ্ঘনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া কেবল একটি যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি বড় ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি।