ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচনী মাঠ দখলে জামায়াতের রাজকীয় পদচারণা: ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

নির্বাচনী মাঠ দখলে জামায়াতের রাজকীয় পদচারণা: ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর মোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরবর্তী সময়ে দেশে যে এক ধরণের রাজনৈতিক রূপান্তর ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত কৌশলী ও সুসংগঠিত ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাজপথের রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা এবং কখনও এককভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসা এই দলটি বর্তমানে এক নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম দিনের নির্বাচনী প্রচারণাতেই তারা যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছে, তা কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পরাশক্তিগুলোর নীতি-নির্ধারণী মহলেও ব্যাপক বিস্ময় ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। রয়টার্স, আল জাজিরা এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে ধারাবাহিক ও গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশ করে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এখন আর কেবল একটি গতানুগতিক ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সংস্কারবাদী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দেশে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দলটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। দলটির বর্তমান নেতৃত্ব এবার এক ভিন্নধর্মী ও আধুনিক নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে, যেখানে সংবিধানের মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি আপসহীন ও কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। এমনকি দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনে তারা এবার বেশ কয়েকজন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য সংখ্যালঘু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতের এই পরিবর্তন কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব রক্ষা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি সুনিপুণ অংশ। বাংলাদেশের এক বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী যারা গতানুগতিক ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে একটি স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক শক্তির খোঁজ করছিল, জামায়াতের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো তাদের সামনে একটি বিকল্প হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে "একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ" গড়ার যে স্লোগান তারা দিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে। দলটির প্রতিটি জনসভায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে।

তবে এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির চেয়েও এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব রাজনীতি বা ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের নীতিনির্ধারকরা জামায়াতের সাথে পর্দার আড়ালে এক ধরনের নিয়মিত ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখছেন। একটি ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ বার্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, আমেরিকা মনে করছে বাংলাদেশের আগামীর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য জামায়াত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশীদার হতে পারে। ওয়াশিংটন মনে করছে, জামায়াত যদি সামনের নির্বাচনে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে বা ক্ষমতার অংশীদার হয়, তবে এই অঞ্চলে আমেরিকার তিনটি কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জিত হবে।

প্রথমত, এই অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য ও প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বড় প্রকল্পগুলোতে রাশিয়ার যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব রয়েছে, তা হ্রাস করে পশ্চিমা বিনিয়োগের পথ সুগম করা। এবং তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগর ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় চীনের যে গভীর নজরদারি ও কৌশলগত আধিপত্য রয়েছে, সেখানে আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানো। এই তিনটি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে আমেরিকা জামায়াতকে একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রতিশ্রুতিশীল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের এই শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ভারতের জন্য চরম উদ্বেগের ও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতকে একটি উগ্র ও পাকিস্তানপন্থী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। দিল্লির নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা হলো, জামায়াত যদি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো নীতিনির্ধারণী বা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পায়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় "সেভেন সিস্টার্স" খ্যাত রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এছাড়াও, জামায়াতের মাধ্যমে চীনের সাথে বাংলাদেশের সখ্যতা ভারতের জন্য এক বিশাল কৌশলগত বিপদ ডেকে আনতে পারে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, জামায়াত ও আমেরিকার এই নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ধরণের টানাপোড়েন ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। ভারতের কূটনীতিকরা ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনের এই নতুন অবস্থানের বিরুদ্ধে তাদের গভীর অসন্তোষ ও শঙ্কার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে যে, ভারত ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে তাদের কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে সরিয়ে নিয়েছে, যা একটি আসন্ন রাজনৈতিক ঝড় বা বড় ধরনের কোনো সংকটের পূর্বাভাস হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকার ও প্রশাসনের ওপর এখন এক পাহাড়সম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রবল দাবি, অন্যদিকে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই—সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন বর্তমানে এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। ইতিমধ্যে কমিশন প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা জারি করেছে, যা মূলত নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার একটি আইনি ও নৈতিক প্রচেষ্টা। তবে মাঠ পর্যায়ে যখন একটি নির্দিষ্ট শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বা পক্ষ সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়, তখন প্রশাসনের নিরপেক্ষ থাকাটা বাস্তবেই একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, জামায়াত যদি এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সুযোগ পায় বা ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়, তবে তা হবে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি মোড় পরিবর্তন। তবে তারা ক্ষমতায় গেলেই যে রাতারাতি দেশে শরীয়া আইন বা কট্টরপন্থা চালু করে ফেলবে, এমনটা ভাবার কোনো বাস্তব ভিত্তি আন্তর্জাতিক মহলে বর্তমানে নেই। কারণ বর্তমান আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা কোনো একটি দলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। জামায়াত নিজেও এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের একটি গ্রহণযোগ্য ও উদার ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে মরিয়া, তাই তারা সম্ভবত উগ্রবাদের চেয়ে সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আইনি সংস্কারের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেবে।

সবশেষে বলা যায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভাগ্য কোন অভিমুখে ধাবিত হচ্ছে। এটি কি কেবল একটি নিয়মিত নির্বাচনী লড়াই, নাকি এটি বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব বিস্তারের এক রণক্ষেত্র? সাধারণ ভোটাররা কি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই জটিল চালের শিকার হবে, নাকি তারা নিজেদের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একটি প্রকৃত সার্বভৌম, স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলবে? ভারতের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা কৌশল বনাম আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই প্রবল লড়াইয়ে জামায়াত এখন একটি অন্যতম ও অনিবার্য ক্রীড়ক। এই ঐতিহাসিক খেলায় শেষ পর্যন্ত কার বিজয় হয় এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী পরিবর্তন আসে, তা দেখার জন্য এখন পুরো বিশ্বের নজর ঢাকার দিকে নিবদ্ধ।