সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘ দুই দশকের আইনি লড়াই শেষে এক যুগান্তকারী বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট' (ইকসিড) এক চূড়ান্ত রায়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোকে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, বিদেশি কোনো সংস্থা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান এই রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশকে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছে, যা দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক বিশাল অর্জন।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, যখন সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পরের বছরই কূপ খননের মাধ্যমে বিভিন্ন গভীরতায় নয়টি সমৃদ্ধ গ্যাস স্তর শনাক্ত করা হয়েছিল। এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস ছাতক সিমেন্ট কারখানা ও পেপার মিলের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হতো। প্রায় ২৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর এক পর্যায়ে কূপে পানি উঠে আসায় সাময়িকভাবে উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিতর্কিত এই গ্যাসক্ষেত্রটি নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর এই হস্তান্তরই কাল হয়ে দাঁড়ায় টেংরাটিলার জন্য। নাইকোর অদক্ষতা ও খননকাজে গাফিলতির কারণে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সেই আগুনে কেবল গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ গ্যাসই পুড়েনি, বরং আশেপাশের জনপদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
বিস্ফোরণের পর পেট্রোবাংলা যখন নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে, তখন প্রতিষ্ঠানটি তা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। ২০০৭ সালে স্থানীয় আদালতে মামলা করার পাশাপাশি নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। আইনি লড়াই যখন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, সেখানেও জয়ী হয় বাংলাদেশ। তবে ধূর্ত নাইকো তাদের পাওনা বিল এবং ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অজুহাতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক আদালত ইকসিডে দুটি মামলা করে। ২০১৪ সালের এক রায়ে ইকসিড প্রাথমিকভাবে পেট্রোবাংলাকে নাইকোর পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল, যা বাংলাদেশকে সাময়িকভাবে কিছুটা চাপে ফেলে দেয়।
পাল্টা লড়াই হিসেবে ২০১৬ সালে নাইকোর অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার তথ্য প্রমাণসহ ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার (তৎকালীন হিসেবে ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দাবি করে ইকসিডে মামলা করে বাপেক্স। দীর্ঘ শুনানি ও উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক বিশ্লেষণের পর ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, নাইকোর তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনাতেই খননকাজ পরিচালিত হচ্ছিল এবং তারা আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নেওয়ার কারণেই যে এই বিস্ফোরণ ঘটেছিল এবং এর জন্য নাইকোই এককভাবে দায়ী—তা আন্তর্জাতিক রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় বাংলাদেশের জন্য কেবল আর্থিক প্রাপ্তি নয়, বরং একটি নৈতিক বিজয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের নামে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে। এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করার সময় অধিকতর সতর্ক থাকবে। টেংরাটিলার আগুনে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সম্পদ নষ্ট হয়েছে এবং পরিবেশের যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়েছে, এই ৪২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থ দিয়ে সেই ক্ষত কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব হবে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইকোর কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্রুত উদ্ধার করা। পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্স এই রায় কার্যকর করার জন্য এখন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।