ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

দিল্লি না পিন্ডি: ভোটের লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াত

দিল্লি না পিন্ডি: ভোটের লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াত

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট এখন আমূল পরিবর্তিত। দীর্ঘ দেড় দশকের একাধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন, যা কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচনে লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং দীর্ঘ সময় কোণঠাসা হয়ে থাকা জামায়াতে ইসলামী। সম্প্রতি দুই দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সমীকরণ এবং দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে স্পষ্ট কিন্তু ভিন্নধর্মী বার্তা দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই নির্বাচনের চুলচেরা বিশ্লেষণ, যা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

নির্বাচনের বাকি আর মাত্র এক সপ্তাহ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা এখন চরমে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের দীর্ঘদিনের ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখার’ কৌশল বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত এক দশকে ভারত তার সমস্ত কূটনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের ওপর বিনিয়োগ করেছিল। হাসিনা একদিকে যেমন ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে সহযোগিতা করে দিল্লির আস্থা অর্জন করেছিলেন, অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব থেকে ঢাকাকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে ড. ইউনূসের অধীনে পাকিস্তানের সঙ্গে বরফ গলতে শুরু করেছে এবং অভিযোগ উঠছে যে, উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিকভাবে মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি এবং জামায়াতের ইশতেহার ভারতের কাছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দলের ইশতেহারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটিকে প্রধান্য দিয়েছেন। একসময় বিএনপিকে ভারতের প্রতি কিছুটা বৈরী ভাবাপন্ন মনে করা হলেও, বর্তমানে দিল্লি তাদের একটি ‘উদার ও গণতান্ত্রিক’ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, তার দল কোনো দেশের ‘প্রভুত্ব’ স্বীকার করবে না, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব বজায় রাখবে। ইশতেহার ঘোষণা কালে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিজের বিষয়েও কারো হস্তক্ষেপ বরদাশত করবে না। ভারতের জন্য এটি একটি স্বস্তির বার্তা হতে পারে, কারণ অতীতে বিএনপির কিছু নেতার বক্তব্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ নিয়ে নেতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তারেক রহমানের বর্তমান সুর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজের দেশের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চান। তার জনপ্রিয় স্লোগান ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’ এখন রাজনৈতিক ময়দানে মূল আলোচনার বিষয়।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে কট্টর ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত এই দলটি এবার তাদের ইশতেহারে ভারতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক’ সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রকাশিত ইশতেহারে সরাসরি পাকিস্তানের কোনো উল্লেখ নেই। বরং তারা ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য জামায়াত এবার অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তারা কেবল প্রতিবেশী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডার মতো পশ্চিমা শক্তির সঙ্গেও গঠনমূলক সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে পাকিস্তানের উল্লেখ না থাকলেও, মুসলিম উম্মাহ বা মুসলিম প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর অঙ্গীকার তাদের পুরনো আদর্শিক ভিত্তিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

জনমত জরিপগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, লড়াই হবে মূলত হাড্ডাহাড্ডি। অধিকাংশ জরিপেই বিএনপিকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে দেখা গেলেও জামায়াত তাদের খুব কাছেই অবস্থান করছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাঁচটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত ছাত্র শিবিরের অভাবনীয় সাফল্য দলটির জনসমর্থনের পালে হাওয়া দিয়েছে। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন জামায়াতের ‘শৃঙ্খল ও আদর্শিক’ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ মাসেই অর্ধশতাধিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে দুই দলের অবস্থান ভিন্ন। জামায়াতের ইশতেহারে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা জোরালো বক্তব্য নেই। তারা কেবল ‘প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার’ অস্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি দূর করতে যথেষ্ট নয়। বিপরীতে, বিএনপি তাদের ইশতেহারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারেক রহমান ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতির ওপর ভিত্তি করে সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইনি সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া নারীদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং পরিবারের নারী প্রধানের নামে বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি নারী ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে।

ভারতের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের স্থিতিশীলতা এবং এই অঞ্চলে চীন-পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে দিল্লির জন্য ঢাকার সহযোগিতা অপরিহার্য। শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপি বা জামায়াত—যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের রসায়ন কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ শান্তি ও নিরাপত্তা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি দিল্লির পররাষ্ট্রনীতির এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা।

বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের এক বিশাল খেলা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বিএনপি ও জামায়াত পূরণ করতে চাইছে। দিল্লির জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসিনাহীন বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বর্তমানে তুঙ্গে। এমন অবস্থায় বিএনপি তাদের ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ তত্ত্ব দিয়ে ভারতকে আশ্বস্ত করতে চাইছে যে তারা দিল্লির স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবে না, তবে নিজেদের সার্বভৌমত্বে ছাড় দেবে না। অন্যদিকে জামায়াতের ‘ভারত-বন্ধুত্ব’ মিশনকে অনেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা মেকআপ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু জামায়াতের ভেতরে যে সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। ভারতের শঙ্কা হলো, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বা ক্ষমতার অংশীদার হলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রশ্রয় পেতে পারে, যা ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর জন্য হুমকি হতে পারে। তবে বিএনপির ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের জন্য আইনি সুরক্ষার যে জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কার জয় হয় এবং সেই জয়ী পক্ষ দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের কাঁটাগুলো কতটা নিপুণভাবে অপসারণ করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফল কেবল বাংলাদেশের ভাগ্য নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির নতুন মানচিত্র তৈরি করবে।