২০২৪ সালের এক রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লব এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন, যা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক অগ্নিপরীক্ষা। একই দিনে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনকাঠামো নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা 'জেন-জি' ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের পরবর্তী কান্ডারি কে হবেন। আর এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখন আস্থায় রাখছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পর থেকেই তারেক রহমান চষে বেড়াচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ২০০৬ সালের পর প্রায় ২০ বছর বিরতি দিয়ে তিনি এখন সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হচ্ছেন। লন্ডনের ভার্চ্যুয়াল সংযোগ থেকে বেরিয়ে এসে মাঠপর্যায়ের এই সফরে তিনি কী দেখছেন? এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংবাদমাধ্যম 'দ্য ডিপ্লোম্যাট'-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, "আগে আমার কর্মসূচি ছিল নেতাকর্মীদের ঘিরে। কিন্তু এখন সব বয়সের, সব শ্রেণির মানুষ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নামছে। বিশেষ করে তরুণদের চোখে যে উদ্দীপনা দেখছি, তা আমাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে।"
অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা: এক ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন
তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বাংলাদেশকে এক লাখ কোটি ডলার বা 'ওয়ান ট্রিলিয়ন ডলার' অর্থনীতির দেশে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি। যদিও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার, তবুও তিনি মনে করেন সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি অসম্ভব নয়। তিনি বলেন, "পোশাকশিল্প ও প্রবাস আয়—যা বিএনপি সরকারের আমলেই ভিত্তি পেয়েছিল—তার পাশাপাশি আমরা আইটি সেক্টর, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (SME) বৈশ্বিক মানে নিয়ে যাব।"
হাসিনা সরকারের আমলের ভয়াবহ দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও তারেক রহমান একে জনগণের সরকার গঠনের মাধ্যমে সমাধানের পথ হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার এবং শক্তিশালী আর্থিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ
তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল মন্ত্র হবে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'। ভারত, চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—যেকোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখা হোক না কেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধাই হবে অগ্রাধিকার। তিনি মনে করেন, ২০ কোটি মানুষের এই দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও লাভের ভিত্তিতে, কোনো একপাক্ষিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।
আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগের জবাবে তারেক রহমান বলেন, "নির্বাচিত সরকারের হাতে থাকে বৈধ কর্তৃত্ব ও জনগণের শক্তি। আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে মানুষ রাতে ভয় ছাড়াই ঘরে ফিরতে পারবে এবং মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে।"
নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা ও নেতৃত্বের অগ্নিপরীক্ষা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটি 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে এই সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য জটিল চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা একদলীয় শাসন ব্যবস্থার কারণে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন—সবকিছুকেই ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে '৩১ দফা' সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে, তা মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার প্রতিশ্রুতি। তবে সমালোচকরা 'উইনার টেইকস অল' বা 'বিজয়ীই সব নিয়ন্ত্রণ করবে'—এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি নিয়ে শঙ্কিত। এর উত্তরে তারেক রহমান তার দলের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, অতীতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেননি।
জেন-জি এবং তারুণ্যের শক্তি
বাংলাদেশের মোট ভোটারের একটি বিশাল অংশ জেন-জি। এই প্রজন্ম কেবল ভোট দিতে চায় না, তারা নীতি নির্ধারণেও অংশগ্রহণ করতে চায়। ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো তারেক রহমানের জন্য একটি গঠনমূলক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন টিআর। তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা ভালো, কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণই সেরা পরিকল্পনাটি বেছে নেবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনাটি বেশ উচ্চাভিলাষী হলেও বর্তমান ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলায় এটি অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতিমুক্তভাবে যদি এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা কেবল পরিবেশ নয়, বরং কৃষি ও মৎস্য খাতেও বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারার দিন নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত লড়াই। তারেক রহমানের ফিরে আসা এবং তারুণ্যের এই জোয়ার যদি একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সরকার উপহার দিতে পারে, তবেই ২০২৪ সালের বিপ্লবের রক্তদান সার্থক হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধা, দক্ষতা এবং ইনসাফের ভিত্তিতে গড়া এক আধুনিক রাষ্ট্র—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।