ঢাকা শহরকে আরও পরিকল্পিত, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে চীনের সাংহাই মডেল অনুসরণ করে বৃহৎ পরিসরের নগর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে রাজধানীর ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত এলাকাগুলোকে ধাপে ধাপে পুনঃউন্নয়নের পরিকল্পনা করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রথম পর্যায়ে পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকা নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৪ মার্চ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা শহরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানতে চান, কীভাবে চীনের সাংহাই অপরিকল্পিত নগরী থেকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও বাসযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাংহাই যদি এমন পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে ঢাকা কেন পারবে না।
বৈঠকে রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থাপত্য অধিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, সাংহাইয়ের পরিবর্তনের মূল ভিত্তি ছিল ল্যান্ড রিডেভেলপমেন্ট বা ভূমি পুনঃউন্নয়ন এবং ব্লকভিত্তিক পরিকল্পিত উন্নয়ন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের দ্রুত এ ধরনের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় রাজউক ‘ঢাকা আরবান রিজেনারেশন প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্পের খসড়া তৈরি করেছে এবং তা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করেছে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম জানান, এ ধরনের পরিকল্পনা আগে থেকেই সংস্থাটির বিবেচনায় ছিল। তবে এবার সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আগ্রহ থাকায় বাস্তবায়নের পথ আরও সহজ হবে বলে তারা আশা করছেন।
রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের আওতায় কোনো এলাকার পৃথক পৃথক ছোট জমিকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। জমির মালিকরা তাদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী ফ্লোর স্পেস বা সম্পত্তির অংশ ফিরে পাবেন। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রশস্ত সড়ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, পুরো ঢাকা একসঙ্গে নয়, বরং পুরান ঢাকার একটি বড় অংশ দিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংহাই মডেলের ধারণা
চীনের বন্দরনগরী সাংহাই একসময় অপরিকল্পিত ও ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছিল। পরে 'গ্রেটার সাংহাই প্ল্যান'-এর আওতায় পুরোনো অবকাঠামো অপসারণ করে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে নগর পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো পরিকল্পনা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে শহরটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক নগরীতে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে বাস্তবায়নের চিন্তা
রাজউকের পরিকল্পনায় জাপানের টোকিওর হিকিফুন এলাকার পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ছোট ছোট প্লট একত্র করে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পর জমির মালিকদের অংশীদারিত্ব অনুযায়ী সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ক্ষেত্রেও একই ধরনের মডেল অনুসরণ করে উন্নয়ন ব্যয় আংশিকভাবে ফ্লোর স্পেস বিক্রির মাধ্যমে সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম ধাপে হাজারীবাগ, বংশাল, চকবাজার, ইসলামবাগ, মৌলভীবাজার, লালবাগ এবং কামরাঙ্গীরচর এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনায় ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্মুক্ত স্থান এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাবুবাজারসংলগ্ন প্রায় ৪০০ একর এলাকায় একই ধরনের একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে জমির মালিকদের বিরোধিতা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্দোলনের মুখে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। সে সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকনও এলাকাবাসীর মতামত ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরোধিতা করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় বিদেশি কোনো মডেল হুবহু অনুসরণ না করে নিজস্ব নগর উন্নয়ন কৌশল তৈরি করা উচিত।
তার ভাষ্য, বিভিন্ন দেশের ভূমি মালিকানা, সামাজিক কাঠামো ও বসবাসের ধরন এক নয়। তাই সাংহাই বা সিঙ্গাপুরের মডেল সরাসরি প্রয়োগের পরিবর্তে বাংলাদেশের বাস্তবতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মডেল প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া জরুরি।