মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ম্যাস ডিপোর্টেশন’ বা গণ-বিতাড়ন কর্মসূচি আইনি বেড়াজালে আটকা পড়ছে। গত কয়েক মাসে হাজার হাজার অভিবাসীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জামিনহীনভাবে আটকে রাখার প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির শত শত ফেডারেল বিচারক। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরাই ট্রাম্প প্রশাসনের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করছেন।
পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র
রয়টার্স এবং নেক্সটাক্স নিউজ নেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আইস (ICE) ডিটেনশনে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৮,০০০-এ পৌঁছেছে। এটি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই ১১,০০০-এর বেশি ‘হেবিয়াস কর্পাস’ (অবৈধ আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে আবেদন) পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। যেখানে ২০২৫ সালে পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৯,২৫০। এর তুলনায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন বছরে এই পিটিশনের সংখ্যা ছিল ১,১০০-এর নিচে। অর্থাৎ, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে আইনি লড়াই বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বিচারকদের কঠোর হুঁশিয়ারি ও আদালত অবমাননা
পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ডিস্ট্রিক্ট বিচারক থমাস জনস্টন, যাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ নিয়োগ দিয়েছিলেন, এক অভিবাসীর মুক্তি আদেশে লিখেছেন:
“সরকার যেভাবে বর্তমান আইনকে উপেক্ষা বা ভুল ব্যাখ্যা করার জেদ ধরছে, তা অত্যন্ত ভয়ানক।”
মিনেসোটার প্রধান বিচারক প্যাট্রিক শিল্টজ এবং বিচারক সুসান নেলসন এমনকি আইস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার (Contempt of Court) অভিযোগ আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সময়মতো বন্ড হিয়ারিং বা জামিন শুনানি না করা এবং আদালতের মুক্তি আদেশ অমান্য করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
আইনের অপব্যাখ্যা বনাম বিচারিক স্বাধীনতা
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের পুরনো একটি অভিবাসন আইনের ‘নতুন ব্যাখ্যা’। গত ৩০ বছর ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় সরকারই নিয়ম মেনে আসছিল যে, কেবল সীমান্ত বা তার কাছাকাছি আটক হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক আটকাদেশ কার্যকর হবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন দেশের ভেতরে থাকা প্রায় সকল অবৈধ অভিবাসীর ক্ষেত্রে এই ‘ম্যান্ডেটরি ডিটেনশন’ নীতি প্রয়োগ করছে।
বিশ্লেষক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি মূল বিষয় লক্ষণীয়:
১. ক্ষমতার লড়াই: ফিফথ সার্কিট কোর্ট অব অ্যাপিলস ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করলেও, জেলা পর্যায়ের শত শত বিচারক একে অসাংবিধানিক বলছেন। এটি মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় একটি আদর্শিক বিভাজন তৈরি করেছে।
২. মানবাধিকার ও আইনি খরচ: হাজার হাজার মানুষকে জামিন ছাড়া আটকে রাখা কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং মার্কিন করদাতাদের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। একেকটি হেবিয়াস পিটিশন মোকাবিলা করতে সরকারের বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
৩. প্রশাসনের অনড় অবস্থান: ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) বিচারকদের এই রায়কে ‘অ্যাক্টিভিস্ট বিচারকদের বাধা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ট্রাম্প কেবল জনগণের ম্যান্ডেট পূরণ করছেন। প্রশাসনের এই অনমনীয় মনোভাব আদালত এবং হোয়াইট হাউসের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলবে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আইনি অচলাবস্থা কাটবে না বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যদি প্রশাসন আদালতের আদেশ উপেক্ষা করা চালিয়ে যায়, তবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জেল বা জরিমানার মতো নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।