ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি অংশীদারত্বে বাংলাদেশ

জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি অংশীদারত্বে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে এলপিজি আমদানি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে মার্কিন উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করেছে সরকার।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ বিকল্প ও স্থিতিশীল উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে এলপিজি আমদানির পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার এলপিজিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত ২৯ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অর্থনৈতিক শাখার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে মার্কিন সহযোগিতা কামনা করা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ১০টি এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে আগ্রহপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে।

মার্কিন পক্ষ বাংলাদেশের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এবং এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সহজতর করতে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসকে সম্ভাব্য সরবরাহকারী কোম্পানির তালিকা দ্রুত পাঠানোরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-সংকট, বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিকল্প সরবরাহ উৎস নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে এলপিজি পরিবহনের কারণে আমদানি ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে, তবুও সরবরাহ নিরাপত্তার দিক থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ একই সঙ্গে মার্কিন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের (ডিএফসি) অর্থায়নের সুযোগ পাওয়ার জন্যও কাজ করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়া এই তহবিল থেকে অর্থায়ন পেলে বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত কিছু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের বিষয়টি এখনও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, প্রয়োজনীয় অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ডিএফসি অর্থায়নের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের জ্বালানি খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। এ বাস্তবতায় জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করাকে সরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের কয়েকটি বড় জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ সুবিধা এবং দেশের দ্বিতীয় তেল শোধনাগার প্রকল্প। দুই দেশের মধ্যে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের মাধ্যমেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশন সরকারের কাছে একাধিক সুপারিশও পাঠিয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সম্ভাব্য মার্কিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা, ডিএফসি অর্থায়নের বিষয়টি নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা, বিনিয়োগের জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পের তালিকা প্রস্তুত রাখা এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ।

জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার এই নতুন অধ্যায় আগামী বছরগুলোতে দেশটির জ্বালানি কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।