ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

জুলাই সনদ রক্ষা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের অঙ্গীকারে তারেক রহমান

জুলাই সনদ রক্ষা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের অঙ্গীকারে তারেক রহমান

রংপুরের ঐতিহাসিক কালেক্টরেট ঈদগাহ ময়দানে শুক্রবার এক জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক রূপরেখা তুলে ধরলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জনাকীর্ণ এই বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র সংস্কারের ইস্যুতে বিএনপি কখনো কোনো ধরনের লুকোচুরি বা অস্পষ্টতা আশ্রয় নেয়নি। তারেক রহমানের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটেছে জুলাই সনদে। এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি শহীদ আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামের ওয়াসিমসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ শহীদের পবিত্র রক্তের আমানত। তারেক রহমান অত্যন্ত আবেগী কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যে স্বপ্ন নিয়ে এই অকুতোভয় তরুণরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদকে সম্মান জানানো এখন প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, রংপুর আজ শহীদ আবু সাঈদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত এক পুণ্যভূমি। জুলাইয়ের সেই গণপরিবর্তনের সুফল যদি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়, তবে জনগণকে আবারও সামনের কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। তবে এই লড়াই রাজপথের নয়, বরং এটি হবে ব্যালট ও গণতন্ত্রের লড়াই। সামনের কাতারে দাঁড়ানোর প্রকৃত অর্থ হলো নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পথে দেশের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যেই তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রতিটি নাগরিককে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, নিশিরাত কিংবা ডামি নির্বাচনের অন্ধকার অধ্যায় এখন চিরতরে শেষ হয়েছে। এখন সময় এসেছে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর। তাই ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা কারচুপি রুখতে সকাল থেকেই ভোটারদের সজাগ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নির্বাচন ও সংস্কারের সমন্বয়। তিনি কেবল ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানেও ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তার মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে যেমন জনপ্রতিনিধি বাছাই হবে, তেমনি গণভোটের মাধ্যমে আগামীর রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হবে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে খোদ দেশের মালিক বা সাধারণ জনগণ। এই দ্বিমুখী ভোটাধিকার প্রয়োগই হবে শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলমানসহ সকল ধর্মের মানুষকে ভোরেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এটি কেবল একটি দলের নির্বাচন নয়, এটি জাতীয় অধিকার আদায়ের এক মাহেন্দ্রক্ষণ।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তারেক রহমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছুড়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নীতি বা কর্মকাণ্ড নিয়ে যে সমালোচনা শোনা যাচ্ছে, তার প্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল আমাদের সঙ্গে টানা পাঁচ বছর সরকারে ছিল এবং তাদের একাধিক মন্ত্রীও সেই মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন যদি আমরা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ভালো হয়ে থাকি, তবে এখন কেন আমাদের নিয়ে এই নেতিবাচক প্রচারণা? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক জোট বা ঐক্য কোনো সাময়িক স্বার্থের বিষয় হওয়া উচিত নয়। মানুষের কাছে সত্য ও সঠিক তথ্য তুলে ধরাই রাজনীতির আসল আদর্শ হওয়া প্রয়োজন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছিল, তা দূর করার চেষ্টা করেছেন এবং দলের শক্তিমত্তা ও সংহতির বিষয়টি প্রমাণ করেছেন।

রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং তথ্যসমৃদ্ধ। তিনি এই অঞ্চলকে কেবল একটি অবহেলিত বা গরিব এলাকা হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, রংপুর একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা এবং এখানকার প্রাকৃতিক ও কৃষিভিত্তিক সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে কয়লা খনি এবং কৃষিজাত পণ্যের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এই বিভাগে বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার পরিকল্পনায় আইটি সেক্টর বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন যে, রংপুরে আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট মেয়াদে কর ছাড় বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে এখানকার শিক্ষিত তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং তাদের আর কাজের সন্ধানে অন্য শহরে পাড়ি দিতে না হয়। ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা এবং পরিবেশ তৈরির আশ্বাসও দেন তিনি।

তারেক রহমান কৃষক এবং নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বিএনপির ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। কৃষকদের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিশেষ কৃষি কার্ড চালু করা হবে এবং অন্তত একটি ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও কীটনাশক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়াও প্রতিটি পরিবারের নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। এটি সরাসরি তৃণমূলের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ও সেচ সমস্যার সমাধানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দেশের নদী-নালা রক্ষায় খাল খনন প্রকল্পের পুনর্জাগরণের কথাও তিনি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তার এই উন্নয়ন ভাবনা জনসভায় উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করে।

সমাবেশের আবহ ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর কিন্তু একই সাথে গাম্ভীর্যপূর্ণ। রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই জনসভায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সরব উপস্থিতি ছিল। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও উত্তরণের পথ নিয়ে আলোকপাত করেন। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের দলীয় প্রার্থীরাও মঞ্চে উপস্থিত হয়ে জনগণের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেন। এই সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি প্রমাণ করতে পেরেছে যে, উত্তরাঞ্চলে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা মজবুত এবং তারা আগামী নির্বাচনের জন্য কতটা প্রস্তুত।

রংপুরে পৌঁছানোর পরপরই তারেক রহমান পীরগঞ্জের লালদীঘি ফতেহপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি আবু সাঈদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন এবং শহীদ আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পরবর্তীতে তিনি আবু সাঈদের শোকাতুর পরিবারের সদস্যদের সাথে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি আবু সাঈদের পরিবারকে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের ছেলের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তারেক রহমানের এই ব্যক্তিগত সফর এবং শহীদ পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা সাধারণ মানুষের মনে দলের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, আবু সাঈদের সাহসই আজ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মনে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জোগাচ্ছে।

বক্তব্যের শেষে তারেক রহমান আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে সাম্য ও ন্যায়ের বাংলাদেশ। সেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরে পাবে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বিএনপি যে রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলছে, তা কেবল গদি দখলের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এক মহৎ উদ্যোগ। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেন যেন তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং কোনোভাবেই যেন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়। রংপুরের এই সফল জনসভা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে, যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তারেক রহমানের কণ্ঠে যে দৃঢ়তা ও সংস্কারের অঙ্গীকার ঝরেছে, তা এক নতুন দিগন্তের হাতছানি দিচ্ছে বলেই মনে করছেন উপস্থিত জনতা।