বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার পেছনে নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল নির্ধারক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, ১৪ ও ১৫ জুলাই নারী শিক্ষার্থীদের সাহসী অগ্রযাত্রাই আন্দোলনকে একটি ছাত্র-বিক্ষোভ থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক গণআন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
মঙ্গলবার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনে জাতীয় নারী শক্তি আয়োজিত ‘জুলাই নারী সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের অবদান, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যায়িত করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ পাঁচটি আবাসিক হলের নারী শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদে শামিল হন। পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর মতে, এই ঘটনাই আন্দোলনকে প্রথমবারের মতো সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে নারী শিক্ষার্থীদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলা, মারধর ও নির্যাতনের ঘটনায় শত শত শিক্ষার্থী আহত হন এবং তাদের অনেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। ওই ঘটনার ভিডিওচিত্র দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এনসিপির এই নেতা দাবি করেন, আন্দোলনের শুরু থেকে গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় পর্যন্ত নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারী নন, বরং নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। এই কারণেই তাদের আলাদাভাবে হামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করে নাহিদ ইসলাম শহীদ মেহেরুন্নিসা ও নাইমা সুলতানাসহ কয়েকজন নারীর নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নারীদের আত্মত্যাগ ও অবদান স্বীকৃত হলেও গত দুই বছরে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নারী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকেই তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে নারীরা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধনসহ নানা বিষয়ে সক্রিয় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পর্যাপ্ত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সমাবেশে উপস্থিত এনসিপি ও জাতীয় নারী শক্তির নেতারা জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রান্তিক নারীসহ সারা দেশের নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং দল-মত নির্বিশেষে নারীদের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীদের ভূমিকাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং তা ছিল নারীদের সাহসী অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হওয়া একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।