ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

জিয়ার পথেই তারেক রহমান: ফারুকীর বিশ্লেষণ ও সরকারের নতুন কর্মযজ্ঞ

জিয়ার পথেই তারেক রহমান: ফারুকীর বিশ্লেষণ ও সরকারের নতুন কর্মযজ্ঞ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তার রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, ব্যক্তিগত সাদাসিধে জীবনাচরণ এবং শহীদ মিনারে মোনাজাত পরিচালনার মতো বিষয়গুলো এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি। এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট নির্মাতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। ফারুকীর মতে, তারেক রহমান আসলে জিয়াউর রহমানের দেখানো সেই ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার পথেই হাঁটছেন।

জিয়াউর রহমানের পথে ফেরা: ফারুকীর পর্যবেক্ষণ

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার স্ট্যাটাসে ১৯৫৩ সালের একটি ঐতিহাসিক ছবির সূত্র টেনে বলেন, এক সময় প্রভাত ফেরি শেষে মোনাজাত করার রীতি ছিল, যা পরবর্তীতে কোনো এক বিশেষ রাজনীতি বা সংকোচের কারণে মুছে ফেলা হয়েছিল। গত ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে তারেক রহমানের মোনাজাত আদায়ের মধ্য দিয়ে সেই হারানো ঐতিহ্য ফিরে এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

ফারুকী বিশ্লেষণ করেন, জিয়াউর রহমানের পথ ছিল এমন একটি রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র গড়া, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় গোপন না করেই মানুষ বহু জাতি-ধর্ম-ভাষার মেলবন্ধনে বাস করবে। তিনি বলেন, "তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন। যেই রিপাবলিকের মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দেয়, মোনাজাতও করে, আবার 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটিও গায়।" তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এবং কারা আমাদের সামষ্টিক স্মৃতি থেকে এই মোনাজাতের সংস্কৃতি মুছে দিতে চেয়েছিল? এটিই বর্তমান বাংলাদেশের অনেক সাংস্কৃতিক সংকটের মূল কারণ বলে তিনি চিহ্নিত করেন।

প্রটোকল ভেঙে সাধারণের কাতারে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো তার ট্রাফিক আইন মেনে চলা। ভিভিআইপি কালচার বা রাস্তা বন্ধ করে চলাচলের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকছেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:

ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) জিল্লুর রহমান: তিনি একে 'অনন্য ও অবিশ্বাস্য' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রপ্রধান এভাবে চললে জনগণের দুর্ভোগ ও কর্মঘণ্টা অপচয় নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এসএন মো. নজরুল ইসলাম: তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকেই প্রটোকল শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি চান না তার জন্য কোনো রাস্তা ক্লিয়ার করা হোক বা শত শত মানুষ অপেক্ষায় থাকুক। যদিও এতে নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্ন ওঠে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি সতর্কতার মাধ্যমে তা সামাল দিচ্ছে।

শনিবার ও রোববার সচিবালয়ে যাওয়ার পথে গুলশানের বাসভবন থেকে সাধারণ গাড়িতে করে যাত্রা করেন তিনি। পথে চারবার সিগন্যালে তাকে সাধারণ মানুষের সাথে অপেক্ষা করতে দেখা যায়, যা পথচারীদের মাঝে ব্যাপক কৌতুহল ও করতালির জন্ম দেয়।

'রকেটের গতিতে' নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন

শুধু আচরণে নয়, প্রশাসনিক কাজেও তারেক রহমান দ্রুততা দেখাচ্ছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিরামহীন কাজ করছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে একের পর এক নীতিনির্ধারণী বৈঠক করছেন।

সরকারের গৃহীত প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ:

১. খাল খনন বিপ্লব: ১৮০ দিনের মধ্যে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি একে জিয়াউর রহমানের ‘খাল খনন বিপ্লবের’ আধুনিক সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

২. ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানান, মে মাস থেকে প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

৩. ফ্যামিলি কার্ড: রমজান ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ৮টি বিভাগের ৮টি উপজেলায় এটি প্রথম চালু হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই জনবান্ধব পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয় হলেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান তার বাবার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ দর্শনকে আধুনিক সময়ের উপযোগী করে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। ধর্ম ও আধুনিকতাকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি একটি নতুন জাতীয় আত্মপরিচয় (National Identity) গড়ার পথে এগোচ্ছেন।

ফারুকীর ভাষায়, এই পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ। যেখানে মানুষ কেবল পৃথিবীর নাগরিক নয়, বরং তার নৈতিকতা ও আখেরাতের চেতনাকেও গুরুত্ব দেয়।