বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর এ মামলার পলাতক অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) আটক করা হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার পর রাজধানী ঢাকার বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাঁকে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে মেজর মোজাফফর হোসেনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয়। পরদিন সন্ধ্যায় তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে (কোর্ট মার্শাল) বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার দিন রাত পর্যন্ত দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার পর মধ্যরাতে তিনি বিশ্রামে যান। কয়েক ঘণ্টা পর সার্কিট হাউসে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় বেতারে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয় এবং তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমদিকে জিয়াউর রহমানের মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়েছিল। পরদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা মরদেহ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যান। পরে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনার পর জাতীয় সংসদ ভবনে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। জানাজা শেষে রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। তবে মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে পলাতক অবস্থায় মেজর খালেদের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ড অন্যতম আলোচিত ঘটনা। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি ব্যাংককে মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেখানে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয় বলে তিনি বইটিতে উল্লেখ করেন।
একই গ্রন্থে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফরই কেবল জীবিত ছিলেন। পরবর্তীকালে মোজাফফর ভারতে এবং খালেদ ব্যাংককে চলে যান বলে বইটিতে দাবি করা হয়েছে।
সাংবাদিক ও লেখক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে মেজর মোজাফফরের ভূমিকার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মোজাফফর দাবি করেছিলেন যে, তিনি জানতেন না প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হবে; তাঁর ধারণা ছিল, তাঁরা শুধু রাষ্ট্রপতিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন।
৪৫ বছর পর মেজর মোজাফফর হোসেনের আটকাদেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও অমীমাংসিত একটি অধ্যায়কে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিচার প্রক্রিয়া শুধু একটি পুরোনো মামলার অগ্রগতিই নয়, বরং ১৯৮১ সালের সেই ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুন তথ্য-উপাত্ত সামনে আনার সুযোগও তৈরি করতে পারে।