ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

জামায়াত ক্ষমতায় আসলে হিন্দুরা জামাই আদরে থাকবে: কৃষ্ণ নন্দী

জামায়াত ক্ষমতায় আসলে হিন্দুরা জামাই আদরে থাকবে: কৃষ্ণ নন্দী

খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে নির্বাচনি হাওয়া। বিশেষ করে খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মঙ্গলবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় এই আসনের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী এক ব্যতিক্রমী ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্য দিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় আসলে হিন্দুরা এ দেশে শুধু নিরাপদই থাকবে না, বরং তাদের জামাই আদরে রাখা হবে। হিন্দুদের মধ্যে জামায়াত নিয়ে যে ভয় বা অপপ্রচার রয়েছে, তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে।

কৃষ্ণ নন্দী তার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করেন। বিশেষ করে ভোটের বাজারে অর্থের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী কখনও টাকা দিয়ে ভোট কেনার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তিনি টাকার বিনিময়ে ভোট কেনাবেচাকে হাটের গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগি কেনাবেচার সঙ্গে তুলনা করেন। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম না নিলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন যে, তারা চাঁদাবাজির টাকার বস্তার মুখ খুলে দিয়েছেন। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠিয়েও ভোট কেনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন। তার মতে, সাধারণ মানুষের মর্যাদা টাকার কাছে বিক্রি হওয়ার মতো নয়।

সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি আগামী ১২ তারিখের গণভোটে প্রথম ভোটটি হ্যাঁ সূচক দেওয়ার এবং দ্বিতীয় ভোটটি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি অঙ্গীকার করেন যে, এই জোট বিজয়ী হলে দেশকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের শাসনকাল মানুষ দেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এখন সময় এসেছে জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশকে সুযোগ দেওয়ার। জনসভায় আগত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে মানুষ পরিবর্তন চাইছে।

সমাবেশের প্রধান অতিথি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে শিল্প ও অর্থনীতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, গত ৫৪ বছরে শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খুলনার শিল্প কলকারখানাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে বন্ধ হওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করে যুবসমাজ ও নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো মামা-খালু বা স্বজনপ্রীতি থাকবে না, বরং মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন যে, নারীদের যথাযথ সম্মানের সঙ্গে ঘরে ও বাইরে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন যে, পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলে সংসদ সদস্যদের সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের সম্পদ লুট করে বিদেশে বেগম পাড়া বা সিঙ্গাপুরে সম্পদ না গড়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি প্রার্থীদের সতর্ক করে দেন যে, তারা যেন জনগণের সম্পদের আমানত রক্ষা করেন। সমাবেশের শেষ পর্যায়ে তিনি খুলনার ছয়টি আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের হাতে নির্বাচনি প্রতীক তুলে দেন। এই সমাবেশে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন।

কৃষ্ণ নন্দীর এই বক্তব্য মূলত হিন্দুদের প্রতি জামায়াতের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার একটি কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, একজন হিন্দুকেও এই দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে হবে না। তিনি মনে করেন, জামায়াত সম্পর্কে যে ধারণা জনমনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। বটিয়াঘাটা ও দাকোপ অঞ্চলের বিশাল হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তার এই ‘জামাই আদর’ শব্দটির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সুকৌশলী।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষ্ণ নন্দীর বক্তব্য এবং ডা. শফিকুর রহমানের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের চিরাচরিত ভাবমূর্তি পরিবর্তনের একটি চেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকে ভাগ বসানো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানোই ছিল এই জনসভার মূল লক্ষ্য। তবে টাকার বস্তার মুখ খুলে দেওয়া বা ডিজিটাল মাধ্যমে ভোট কেনার যে অভিযোগ তারা তুলেছেন, তা সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং শিল্পের পুনর্জাগরণ সবসময়ই একটি সংবেদনশীল ইস্যু। আগামী দিনের নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের মনে কতটা প্রভাব ফেলে, তা দেখার বিষয়।