বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে যখন নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে মাঠ গরম করে তুললেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তার এই বক্তব্য। গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাজীর হাট বড় মাদ্রাসায় বোখারি শরিফ খতম উপলক্ষে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিলে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে, মুসলমানদের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া ‘জায়েজ হবে না’, বরং তা ‘হারাম’। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের উপস্থিতিতে। হেফাজত আমির যখন এই মন্তব্য করছিলেন, তখন তার পাশেই বসে ছিলেন বিএনপি নেতা সারোয়ার। জামায়াতের রাজনীতিকে সরাসরি আক্রমণ করে বাবুনগরী বলেন, “সমস্ত মুসলমানদের বলুন, তাদের ভোট দেওয়া জায়েজ হবে না। এটি হারাম।” তিনি কেবল এটিকে একটি রাজনৈতিক ভোট হিসেবে দেখেননি, বরং একে ‘ঈমানি লড়াই’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সারোয়ার আলমগীরকে উপস্থিত জনতা ও ছাত্রদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা উনাকে সামনে রেখে মওদুদির জামায়াতের সঙ্গে জিহাদ করছি। আমি নির্বাচন বুঝি না, এটি আমাদের জন্য একটি জিহাদ।”
আল্লামা বাবুনগরীর বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়। তিনি দাবি করেন, জামায়াত যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে, তবে তা ইসলামের মৌলিক কাঠামোর জন্য বিপর্যয়কর হবে। তার ভাষায়, “জামায়াত ক্ষমতায় এলে ইসলামের গোড়া কেটে যাবে, ইমানের গোড়া কেটে যাবে।” এছাড়া দলটির অতীত সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি তাদের ‘রগ কাটার গোষ্ঠী’ হিসেবেও অভিহিত করেন। উল্লেখ্য যে, হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিরোধ রয়েছে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটি জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর ব্যাখ্যার ঘোর বিরোধী।
নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে হেফাজত আমিরের এই কঠোর অবস্থান জামায়াতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে হেফাজতের অনুসারীদের একটি বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর উপস্থিতিতে দেওয়া এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, নির্বাচনী লড়াইয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিলেও জামায়াতকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয় হেফাজত। আল্লামা বাবুনগরী এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের কড়া সমালোচনা করেছেন, তবে ভোটের আগমুহূর্তে সরাসরি ‘হারাম’ ফতোয়া দেওয়া এবং একে ‘জিহাদ’ হিসেবে ঘোষণা করা রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত,আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর এই সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের ইসলামি ধারার রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আবারও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ঐতিহাসিকভাবেই কওমি ওলামা এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ‘আকিদাগত’ বা আদর্শিক পার্থক্য বিদ্যমান। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন বিএনপি ও জামায়াত একটি নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে, তখন হেফাজত আমিরের এই অবস্থান সরাসরি ভোটের মেরুকরণকে প্রভাবিত করবে। ফটিকছড়ির মতো জায়গায় যেখানে ধর্মীয় ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ঘোষণা জামায়াতের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজত আমির বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মূলত জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করার কৌশল নিয়েছেন। এর ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে একটি দ্বিধা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াতকে ‘রগ কাটার গোষ্ঠী’ বলা বা তাদের ক্ষমতায় আসাকে ‘ঈমান ধ্বংসের’ কারণ হিসেবে দেখানো ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী দিনে বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই ফতোয়া কেবল একটি নির্বাচনী বক্তব্য নয়, বরং এটি জামায়াতের দীর্ঘদিনের ‘ইসলামি ব্র্যান্ডিং’কে চ্যালেঞ্জ করার একটি বড় প্রয়াস।