দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীর ‘অলি শাসনের’ অবসান ঘটল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে তার ছেলে ওমর ফারুক পরাজিত হয়েছেন। শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে মাত্র ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে তাকে হারিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেছে বিএনপি। ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে এলডিপির ওমর ফারুক ছাতা প্রতীকে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।
পতনের নেপথ্যে যত সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কর্নেল অলির এই পতনকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হিসেবে দেখছেন। বিজয়ী জসিম উদ্দীন আহমেদ ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘরানার একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। তাকে দলে টেনে বিএনপি যেমন চমক দিয়েছিল, তেমনি জসিমও অলি-পুত্রকে হারিয়ে দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান ঘটালেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরাজয়ের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:
১. জামায়াত-বিদ্বেষ ও জোটের বৈপরীত্য: অলি আহমদ সারা জীবন জামায়াতে ইসলামীর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্ষমতার সমীকরণে সেই জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ১১ দলীয় জোটে যোগ দেওয়াকে সাধারণ ভোটাররা সহজভাবে গ্রহণ করেননি।
২. বিএনপির সাথে দূরত্ব: বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও দল ছেড়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার কারণে বিএনপির তৃণমূলের বিশাল একটি অংশ অলির ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
৩. বিদ্রোহী প্রার্থীর কাঁটা: এই আসনে মিজানুল হক চৌধুরী নামে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি অলির ছেলের ভোট ব্যাংকে বড় ধরনের ভাগ বসিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেয়।
উন্নয়নের কারিগর বনাম রাজনৈতিক বিতর্ক
১৯৮১ সালের উপনির্বাচন থেকে শুরু করে মোট ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বীর বিক্রম অলি আহমদ। ১৯৯১ সালে যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালীন চন্দনাইশে তিনি যে অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন করেছিলেন, তারই প্রতিদানে মানুষ দল-মত নির্বিশেষে তাকে দশকের পর দশক ভোট দিয়ে আসছিল। এমনকি বিএনপি থেকে বেরিয়ে এলডিপি গঠন করার পরও ২০০৮ সালে তিনি নিজের জনপ্রিয়তায় জয়ী হন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে নিজে না দাঁড়িয়ে উত্তরসূরি হিসেবে ছেলেকে ‘বলি’ দিলেন কি না—সেই প্রশ্ন এখন চন্দনাইশের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
বিশ্লেষণী দৃষ্টি: এক সাম্রাজ্যের সমাপ্তি?
বর্তমানে ৮৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। চন্দনাইশের রাজনীতিতে তাকে আর কোনোদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপিকে হারানো, অন্যদিকে আদর্শিক শত্রু জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়েও জয় না পাওয়া—কর্নেল অলির জন্য এটি যেন ‘একূল-ওকূল দুই কূল হারানো’র এক ট্র্যাজেডি। একসময়ের ‘কিংমেকার’ অলি আহমদ এখন নিজ গড়েই অস্তিত্ব সংকটে।