বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি কার্যক্রম, সিএনজি পরিবহন খাত এবং আবাসিক গ্রাহকরা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন।
বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে। এই ঘাটতি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর। মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যমান সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা ডিজেল ও এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। সেখানে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের এক-তৃতীয়াংশও পাচ্ছে না। ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করেছে, আর অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন কিংবা অলস সময় পার করছেন।
রপ্তানিমুখী পোশাক ও বস্ত্র খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল কিংবা মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
দেশের বস্ত্রশিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোতেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
শুধু শিল্প খাত নয়, সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা শহরে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেখানেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় রান্নার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষ বিকল্প হিসেবে এলপিজি, বৈদ্যুতিক চুলা ও ইন্ডাকশন কুকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। অনেক পরিবার গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে পরদিনের রান্না সেরে রাখছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের দ্রুত শিল্পায়ন ও বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী ও স্থিতিশীল করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির আমদানিনির্ভর গ্যাস অবকাঠামোর ঝুঁকিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা।