ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

গ্যাস সংকটে বাংলাদেশের শিল্প খাত, শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমছে

গ্যাস সংকটে বাংলাদেশের শিল্প খাত, শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমছে

বাংলাদেশের শিল্প খাত এখন তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৫৮ শতাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। এর ফলে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

শিল্প মালিকদের ভাষ্য, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যাংকিং খাত একযোগে চাপের মুখে পড়বে। তারা দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের তুলনায় সরবরাহ কয়েকগুণ কমে গেছে। অনেক ডায়িং ও স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১২১টি স্পিনিং মিল ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়িং কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে সিএনজি বা এলপিজি ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

রপ্তানিকারকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, উৎপাদনে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত বা অন্য দেশে স্থানান্তর করতে পারেন, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সংকট

দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে। উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারের ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

ময়মনসিংহের ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ এবং সাভার-আশুলিয়াতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঘন ঘন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক কারখানা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সার শিল্পেও উৎপাদন বন্ধ

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) কয়েক মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। যদিও কাফকোতে সীমিত গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেখানে বিদ্যমান শিল্প পরিবেশ মূল্যায়ন করে থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতও এ সংকটের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। গ্যাস সংযোগের অভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা শিল্পযন্ত্র দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকলে তা ঋণ খেলাপির ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শিল্পায়নের বর্তমান ধারা বজায় রাখতে জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে উৎপাদন হ্রাস, রপ্তানি আয়ে চাপ, কর্মসংস্থান সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের শিল্পখাত এমন এক সময়ে এই সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যখন দেশটি উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এখন শুধু শিল্পখাতের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।