গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারানোর পর নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এতে গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি শাস্তি, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খসড়া আইন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে খসড়ার বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা হয় এবং সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরেকটি বৈঠকে বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশনপ্রধান ও উন্নয়ন সহযোগীদের মতামতও নেওয়া হবে।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে কারাদণ্ডের বিধানে পরিবর্তন এনে সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের অধ্যাদেশে কারাদণ্ডের মেয়াদ ছিল অনধিক ১০ বছর।
নতুন আইনে চার ধরনের অপরাধকে গুম-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো, গুম, গুমের কারণে মৃত্যু, আলামত নষ্ট করা এবং গোপন আটককেন্দ্র স্থাপন। পাশাপাশি গুম সংঘটনে সহযোগিতাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়ায় তদন্ত ও বিচার সম্পন্নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গুমের অভিযোগের তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। এরপরও তদন্ত শেষ না হলে আদালতকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। একইভাবে বিচার ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে তিন দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করতে হবে।
তদন্তকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে সংঘটিত পদ্ধতিগত গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যদিকে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব থাকবে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এ ধরনের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
খসড়া আইনে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্যও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে গুমের শিকার হিসেবে সনদ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। সেই সনদের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্যরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি বণ্টন, হস্তান্তর, ব্যাংকিং কার্যক্রমসহ বিভিন্ন আইনি সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
সূত্র জানায়, আইসিটির অধীনে তদন্তাধীন পদ্ধতিগত গুমের মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে গুমের সনদ আইসিটিই প্রদান করতে পারবে, এমন একটি প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে পুলিশের তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত সনদ দেবে।
খসড়া প্রণয়নের সময় কিছু মহল থেকে পৃথক আইন না করে প্রচলিত দণ্ডবিধি ও হেফাজতে নির্যাতন প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন সংশোধনের মাধ্যমে গুমের শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শও দেওয়া হয়। তাদের যুক্তি, বলপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী অনেক দেশ বিদ্যমান আইন সংশোধনের মাধ্যমেই এ অপরাধের বিচার নিশ্চিত করেছে। তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া অধিকাংশের মতামত অনুযায়ী, গুমের মতো অপরাধের জন্য স্বতন্ত্র আইন করাই বেশি কার্যকর হবে।
তবে নতুন আইনে পৃথক কোনো গুম কমিশন রাখার প্রস্তাব নেই।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, গুমের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিবর্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি সংস্থার হাতে থাকা উচিত। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের অধীনে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তদন্ত কাঠামো গড়ে তোলা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একই বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত হলে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ জন এবং জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ৭৪৭ জন নেতাকর্মী গুমের শিকার হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি আর ফিরে আসেননি। একই সঙ্গে গুম থেকে ফিরে আসা ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে গুমের অভিযোগে র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। এ প্রেক্ষাপটে গুমকে স্বতন্ত্র ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।