আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ দিন হতে যাচ্ছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং চারটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে বহুল আলোচিত গণভোট। তবে ভোটের মাসখানেক আগে থেকেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপক প্রচারণা নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—সরকারের এমন সক্রিয় অবস্থান নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে কি কালিমালিপ্ত করছে?
প্রচারণার নেপথ্যে ‘জুলাই সনদ’
অন্তর্বর্তী সরকার মূলত ‘জুলাই সনদের’ আলোকে চারটি বিষয়ে জনগণের রায় চাচ্ছে:
১. স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।
২. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন।
৩. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ।
৪. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতাসহ ৩০ দফা সংস্কার।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে শুরু করে ব্যাংক, স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জোয়ার বইছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্মিত ভিডিওতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও গুম কমিশনের সদস্যদের রাখা হয়েছে জনমত গড়তে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলেও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) যদি সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রচারণায় সরাসরি যুক্ত হন, তবে সংসদ নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
বিখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, "সরকারের এই অবস্থান গণভোটের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। যদি ভোটাররা প্রচারণার চাপে ভোট দেন, তবে ভবিষ্যতে এটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।"
রাজনৈতিক অঙ্গনের মেরুকরণ
আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার কথা থাকলেও বড় দলগুলো এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে:
জামায়াতে ইসলামী: সংস্কারের পক্ষে থেকে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থন দিচ্ছে।
বিএনপি: নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, রায় দেওয়ার মালিক জনগণ, এখানে দলের পক্ষ থেকে প্রচারণার কিছু নেই।
এনসিপি: জুলাই সনদে সই না করলেও তারা আসনভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়োগ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় নামছে।
চ্যালেঞ্জ যেখানে
সরকার বলছে, এই সংস্কারগুলো না হলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। কিন্তু সমালোচকদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা দেওয়া নির্বাচনের নিরপেক্ষ পরিবেশের পরিপন্থী। শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে এই প্রচারণার প্রতিফলন কতটুকু ঘটে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।