ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতায় গেলে ‘বিডিআর’ নাম পুনর্বহালের ঘোষণা তারেক রহমানের

ক্ষমতায় গেলে ‘বিডিআর’ নাম পুনর্বহালের ঘোষণা তারেক রহমানের

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক নির্বাসন ও সংগ্রামের পর নতুন এক প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষা রূপরেখা পেশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৬ সালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে তার এই ঘোষণা কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান স্তম্ভ সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শনিবার রাজধানীর একটি কনভেনশনে ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুদৃঢ় আস্থা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। তার এই বক্তব্যের প্রধানতম আকর্ষণ হলো—বিজিবি বা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’ বা বিডিআর রাখা। এটি কেবল একটি নাম পরিবর্তন নয়, বরং ২০০৯ সালে পিলখানায় ঘটে যাওয়া নির্মম সেনা হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের স্মৃতিকে নতুনভাবে মূল্যায়নের এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তারেক রহমানের এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক এবং আবেগীয় প্রেক্ষাপট। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিডিআর নামটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি নাম। পিলখানায় ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিডিআরের নাম এবং পোশাকের রঙ পরিবর্তন করেছিল। তারেক রহমানের মতে, এটি ছিল বাহিনীর ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রয়াস। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের রায়ে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে বিডিআরের সেই হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে।

এই ঘোষণার একটি বিশেষ দিক হলো সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর উন্নয়ন এবং সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। তারেক রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পে’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি মূলত অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মরত সেনা সদস্যদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি, যা বাস্তবায়িত হলে বাহিনীর অভ্যন্তরে বৈষম্য দূর হবে এবং সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ব্যক্তিগত আবেগ ও শৈশবের স্মৃতি। তিনি স্মরণ করেছেন তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে, যিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রূপকার এবং স্বাধীনতার ঘোষক। সেনানিবাসের পরিবেশে বেড়ে ওঠা তারেক রহমান নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর একটি বর্ধিত পরিবারের অংশ হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি মনে করেন, একজন সেনাপ্রধানের সন্তান হিসেবে এবং সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের উত্তরাধিকারী হিসেবে তার দায়িত্ব অনেক বেশি। তার বর্ণনায় তার মা বেগম খালেদা জিয়ার আমলের সেই আস্থার পরিবেশটি ফিরে এসেছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী ছিল দেশের সার্বভৌমত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছিল এক তাঁবেদার ও অপশক্তির মাধ্যমে। সেই সময়ে সেনাবাহিনীকেও তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। তারেক রহমানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সেই অভিশপ্ত দিনে সেনাবাহিনীকে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে না দেওয়া ছিল একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি। তাই তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২৫শে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ অথবা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে।

রাজনীতি এবং সেনাবাহিনীর মধ্যকার দূরত্বের বিষয়ে তারেক রহমানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও দূরদর্শী। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে বা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজে ব্যবহার করা হবে না। এটি একটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী ঘোষণা, কারণ বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা বাহিনীর পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারেক রহমান মনে করেন, সেনাবাহিনীর কাজ হলো দেশের সীমান্ত রক্ষা করা এবং বহিরাগত শত্রু থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা; তাদের রাজনীতির চাদরে আবর্তিত হওয়া উচিত নয়। তবে তিনি এও সতর্ক করেছেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন হয়, তখন সেনাবাহিনীকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। তার এই বক্তব্যে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার প্রতি এক ধরনের গভীর সম্মান প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন এবং সেনা আইনের সংস্কারের যে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, তা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এই উদ্দেশ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে, যারা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের আবেগঘন বক্তব্য এবং তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা তারেক রহমানের বক্তব্যের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মেজর (অব.) মিজানুর রহমানের মতো কর্মকর্তারা যখন তাদের ওপর হওয়া অবর্ণনীয় নির্যাতনের বর্ণনা দেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল হয়ে যাওয়ার একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। তারেক রহমান এই প্রেক্ষাপটে নিজেকে একজন সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যিনি জনগণের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে চান। তিনি মনে করেন, বিএনপি শক্তিশালী থাকলে বাংলাদেশ শক্তিশালী থাকে এবং বাংলাদেশ শক্তিশালী থাকলে সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা অটুট থাকে। তার এই দর্শনের মূলে রয়েছে জাতীয়তাবাদ এবং সার্বভৌমত্বের এক নিবিড় সংযোগ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যদি সুসংহত না হয়, তবে কোনো বাহিনীই তাদের গৌরব ধরে রাখতে পারে না। তারেক রহমানের এই দীর্ঘ ও তথ্যবহুল বক্তব্যটি কেবল একটি দলের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও পেশাদার প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ব্লু-প্রিন্ট। তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক মারণাস্ত্র এবং উন্নত প্রশিক্ষণে সজ্জিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তার পিতার আদর্শকে ধারণ করে তিনি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে এবং দেশের সেনাবাহিনী হবে বিশ্বের বুকে এক অনন্য পেশাদার বাহিনী। পরিশেষে, তারেক রহমানের এই পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি জনগণের রায় এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার এই ‘বিডিআর প্রত্যাবর্তন’ এবং ‘প্রতিরক্ষা সংস্কার’ প্রস্তাব দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনের ভোটের লড়াইয়ে এক বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়াতে পারে।