ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৭:২৪ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ওসমান হাদির ওপর হামলার সমর্থনে ভারতের অনলাইনে সমন্বিত অপপ্রচার

ওসমান হাদির ওপর হামলার সমর্থনে ভারতের অনলাইনে সমন্বিত অপপ্রচার

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরপরই ঢাকার ব্যস্ত সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তিনি বর্তমানে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ধারাবাহিক হত্যার হুমকির মধ্যেই এই হামলার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঘটনার নিন্দা জানালেও, এই হত্যাচেষ্টার বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া এবং ব্যাপক বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

ভারতের স্বার্থরক্ষার দাবি: 'গ্রেটার বাংলাদেশ' তত্ত্বের মাধ্যমে অপপ্রচার

স্বাধীন অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট–এর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক হিন্দুত্ববাদী অনলাইন অ্যাকাউন্ট এবং আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্টরা এই হামলার ঘটনাকে সমর্থন করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে হামলাকারীদের ভারতের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রশংসা করা হয়।

ভারতের সাবেক সেনাকর্মকর্তা ও ভারতীয় ক্যাম্পেইন গ্রুপ Youth4Nation – TN Chapter-এর সাধারণ সম্পাদক মেজর মাধান কুমার (অব.) সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দাবি করেন, ওসমান হাদি ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল দখল করে 'গ্রেটার বাংলাদেশ' গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং ঢাকায় অজ্ঞাতনামাদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মেজর মাধান কুমারের সাম্প্রতিক পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপির) পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ভারতীয় কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট থেকে সমন্বিতভাবে এই ভিত্তিহীন দাবি ছড়ানো হয় যে, ওসমান হাদি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দখল করে 'গ্রেটার বাংলাদেশ' গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই দাবির পক্ষে তার একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, মূল পোস্টে বাংলাদেশ ও ভারত আলাদা রঙে চিহ্নিত ছিল।

#Dhurandhar হ্যাশট্যাগ ও হত্যার হুমকি

ভারতীয় অ্যাকাউন্টগুলো #Dhurandhar হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে হামলাকে সমর্থন জানায়। হ্যাশট্যাগটি একটি বলিউড স্পাই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, অভিযোগ রয়েছে এটিকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী অ্যাকটিভিস্ট ও বিজেপির ক্যাম্পেইনার ড. রাজেশ পাটিল এক দীর্ঘ পোস্টে ওসমান হাদির তথাকথিত ভারত দখলের মনগড়া পরিকল্পনা বর্ণনা করে দাবি করেন, একজন #Dhurandar হাদীকে তার ভারতবিরোধিতার জন্য হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি আরও দাবি করেন, যারা ভারতবিরোধিতা করবে, #Dhurandar তাদের দেখে নেবে এবং ভারত যেভাবে বাংলাদেশ তৈরি করেছে, সেভাবে চাইলে ধ্বংসও করতে পারে।

Bhakt Prahlad নামের আরেক ভারতীয় অ্যাক্টিভিস্ট ওসমান হাদীকে ভারতবিরোধী দাবি করে লেখেন, "এটা নতুন ভারত—#Dhurandhar তোমার জায়গায় গিয়ে তোমাকে হত্যা করবে।"

ভিত্তিহীন অভিযোগ ও বিকৃত ভিজ্যুয়াল

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ওসমান হাদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি সীমান্তে ঝুলিয়ে হত্যার আহ্বান জানানো পোস্টও ছড়ানো হয়েছে। হামলার আগে থেকেই ওসমান হাদি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকির কথা জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টাও করা হয়। বিভিন্ন পোস্টে রাজনৈতিক নেতাদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ তোলা হয় এবং এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও বিকৃত ভিজ্যুয়াল ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ উঠেছে। দ্য ডিসেন্ট–এর যাচাইয়ে দেখা গেছে, এসব ভাইরাল ছবির সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল নেই এবং সেগুলোর বেশিরভাগই কৃত্রিমভাবে তৈরি বা বিকৃত।

বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান হাদির ওপর হামলার পর একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন অপপ্রচার শুরু হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করা এবং ঘটনার প্রকৃত দিক আড়াল করা।