বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতারও সরাসরি প্রভাব বহন করছে। এমন প্রেক্ষাপটে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
এডিবির প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (জুলাই ২০২৬) অনুযায়ী, চলতি বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। তিন মাস আগে প্রকাশিত এপ্রিল সংস্করণে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পূর্বাভাস শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চলমান অনিশ্চয়তারও ইঙ্গিত বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে জ্বালানি, সার এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এসব চাপের সরাসরি প্রভাব অনুভব করছে।
এডিবি আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের জন্যও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। আগে এই হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে চলতি বছরের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৯ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হলেও আগামী বছরের মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে।
এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে শুধু জ্বালানিই নয়, সার, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়বে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির পাশাপাশি এশিয়ার অনেক দেশেও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এডিবি। ভারতের চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ২০২৭ সালের জন্য ভারতের পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের অর্থনীতির মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শক্তিশালী রপ্তানি ও অবকাঠামো খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগের কারণে চলতি বছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আগামী বছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে। ফিলিপাইনের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ফিজির ২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রয়েছে। একই সময়ে থাইল্যান্ডের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এডিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কিছুটা কমে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে পারলে বৈশ্বিক চাপের প্রভাব অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।