এখন সময় বিশ্লেষণ • প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪৭ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

উন্নয়নের সাজানো গল্প আর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের লুটপাট

উন্নয়নের সাজানো গল্প আর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের লুটপাট

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে “উন্নয়ন” শব্দটি শুধু অর্থনৈতিক নীতি ছাপিয়ে একসময় ক্ষমতার প্রধান রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়েছিল। শাসনের বৈধতা, নির্বাচনের বিতর্ক, মানবাধিকার প্রশ্ন, প্রশাসনিক দমন, এসব আলোচনার জবাব হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাক্য ছিল: “আমরা উন্নয়ন করেছি।” অবকাঠামো নির্মাণ, মেগা প্রকল্প, দৃশ্যমান স্থাপনা, এসবই রাষ্ট্রীয় প্রচারণার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসে: উন্নয়ন কি সত্যিই অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ফল ছিল, নাকি উন্নয়নকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক স্থায়িত্বের ঢাল হিসেবে?

একটি রাষ্ট্রে যখন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, তখন উন্নয়ন প্রকল্প কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকে না, এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার অর্থনীতি। প্রকল্প মানে শুধু সেতু বা রেললাইন নয় দরপত্র, সরবরাহ, জমি অধিগ্রহণ, সাব কন্ট্রাক্ট, পরামর্শক নিয়োগ, সময় বৃদ্ধি, সংশোধিত ব্যয়। এই পুরো চক্রের প্রতিটি ধাপে অর্থের প্রবাহ। আর এই প্রবাহ যত বড়, তত বড় হয় প্রভাব ও কমিশনের সুযোগ।

গত এক দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, প্রাথমিক ব্যয় অনুমান ও চূড়ান্ত ব্যয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বহু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক মাত্রায় হয়েছে এবং বিলম্বের ফলে সুদ-খরচ ও প্রশাসনিক ব্যয় আরও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যয়বৃদ্ধির একটি অংশ স্বাভাবিক হলেও বড় অংশ এসেছে পরিকল্পনার দুর্বলতা, প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র ও অস্বচ্ছ ক্রয়-প্রক্রিয়া থেকে। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিফলনও।

পদ্মা সেতু এই বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রতীক। বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালে প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়ে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে। সরকার এটিকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে রূপ দেয় এবং নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প সম্পন্ন করে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই ঘটনাটি দুটি বাস্তবতা একসঙ্গে দেখায়। একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট। অর্থনৈতিকভাবে একটি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে আসে। কারণ উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নয়, বিনিয়োগকারীর আস্থা, ঋণপ্রাপ্তি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সবকিছুর সঙ্গে জড়িত।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের “বালিশ কেলেঙ্কারি” সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি আবাসিক ভবনের বালিশ ক্রয় নিয়ে যে অতিমূল্যের অভিযোগ প্রকাশ পায়, তা প্রথমে হাস্যরসের বিষয় মনে হলেও পরে দেখা যায় এটি ছিল বৃহত্তর ক্রয় অসঙ্গতির লক্ষণ। ছোট সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বড় সরবরাহে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেখানো, এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাব, সব মিলিয়ে বোঝা যায় বড় প্রকল্পে দুর্নীতি সবসময় বড় টাকার একবারের আত্মসাৎ নয় বরং হাজার ছোট লেনদেনের ধারাবাহিক সঞ্চয়।

কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে প্রতিটি প্রকল্পেই ব্যয় পুনর্নির্ধারণ ও সময়সীমা বৃদ্ধি একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব আসা প্রশাসনিকভাবে উদ্বেগজনক, কারণ পরিকল্পনা পর্যায়ে যথাযথ সমীক্ষা থাকলে এই পরিবর্তন এত বড় হওয়ার কথা নয়। উন্নয়ন অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো: পরিকল্পনা যত দুর্বল, ব্যয় তত বাড়ে। বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে প্রথমে প্রকল্প ঘোষণা, পরে পরিকল্পনা। ফলে প্রকল্প শুরু হয়ে গেলে তা থামানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে, আর তখন অতিরিক্ত ব্যয় “অনিবার্য” হিসেবে অনুমোদিত হয়।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প নাগরিক দুর্ভোগের প্রতীক। দীর্ঘ বিলম্ব, বারবার নকশা পরিবর্তন, টেন্ডার জটিলতা সব মিলিয়ে এটি দেখিয়েছে, দুর্বল প্রশাসনিক সমন্বয় কীভাবে একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে জনদুর্ভোগে পরিণত করতে পারে। এখানে অর্থের ক্ষতি যেমন হয়েছে, তেমনি উৎপাদনশীলতার ক্ষতিও হয়েছে। যানজট, দুর্ঘটনা, সময় অপচয়, জ্বালানি ব্যয় এসবের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে প্রকৃত ব্যয় আরও বড়।

সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রভাব দেখা যায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। দ্রুত বিদ্যুতায়নের নামে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়, যেখানে “ক্যাপাসিটি পেমেন্ট” ব্যবস্থা চালু ছিল, বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রকে অর্থ দিতে হবে। ফলাফল দাঁড়ায়, অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ প্রদান করতে হয়েছে। এই অর্থ শেষ পর্যন্ত ভর্তুকি ও ঋণের মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি সরাসরি ঘুষের মতো দৃশ্যমান না হলেও নীতিগতভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থের কাঠামোগত অপচয়।

এনার্জি খাতে দরপত্রবিহীন বা সীমিত প্রতিযোগিতার চুক্তির অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় ও বাধ্যতামূলক পরিশোধের কারণে রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি, ভর্তুকি সংকট, এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতা দেখায় দুর্নীতি সবসময় টাকা চুরি করে পকেটে নেওয়া নয় অনেক সময় নীতির কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অর্থ দিতে বাধ্য হয়। এটিই কাঠামোগত লুটপাট।

উন্নয়ন প্রকল্পের আরেকটি প্রভাব হলো ঋণনির্ভরতা। বড় প্রকল্প মানেই বৈদেশিক ঋণ, আর ব্যয়বৃদ্ধি মানেই ঋণ বৃদ্ধি। সুদ পরিশোধের চাপ বাড়লে বাজেটের সামাজিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ সংকুচিত হয়। অর্থাৎ দৃশ্যমান উন্নয়ন বাড়লেও মানবিক উন্নয়ন তুলনামূলক ধীর হয়ে পড়ে।

এখানেই উন্নয়নের রাজনৈতিক ব্যবহার স্পষ্ট হয়। যখন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ সীমিত, তখন উন্নয়নকে প্রচারণার হাতিয়ার বানানো সহজ হয়। দৃশ্যমান স্থাপনা দ্রুত জনমত প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। ফলে জনগণ সেতু দেখে সন্তুষ্ট হয়, কিন্তু ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণ খেলাপি, মুদ্রাস্ফীতি এসব ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অতএব প্রশ্নটি উন্নয়ন হয়েছে কি হয়নি তা নয়। বাস্তবতা হলো, উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সেই উন্নয়ন কতটা দক্ষ, কতটা স্বচ্ছ, এবং কতটা টেকসই এই প্রশ্নই মূল। কারণ উন্নয়ন তখনই সফল, যখন তা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। আর ব্যর্থ, যখন তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মেগা প্রকল্পের প্রয়োজন আছে, কিন্তু মেগা জবাবদিহিরও প্রয়োজন আছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বাধীন অডিট, সংসদীয় তদারকি, এবং প্রকল্প পরিকল্পনায় বাস্তবসম্মততা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। নইলে সেতু থাকবে, কিন্তু অর্থনীতি দুর্বল হবে। বিদ্যুৎ থাকবে, কিন্তু বিলের চাপ বাড়বে। অবকাঠামো থাকবে, কিন্তু আস্থা থাকবে না।

“উন্নয়নের সাজানো গল্প” ভাঙার একমাত্র উপায় উন্নয়ন বন্ধ করা নয় বরং উন্নয়নকে রাজনীতি থেকে মুক্ত করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক করা। উন্নয়নকে যদি প্রচারণা নয়, নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় তবেই উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে জনগণের সম্পদে পরিণত হবে, ক্ষমতার সম্পদে নয়।