ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:০৮ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ইকোনমিস্টের পূর্বাভাসঃ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন তারেক রহমান

ইকোনমিস্টের পূর্বাভাসঃ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন তারেক রহমান

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ সংখ্যায় সাময়িকীটি দাবি করেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ষাট বছর বয়সী এই নেতাকে ইকোনমিস্ট একটি খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এখন ক্ষমতার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সন্ধিক্ষণ। প্রায় ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর এটিই হবে দেশের প্রথম সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। সেই বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল জেনারেশন জেড বা আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। ইকোনমিস্টের মতে, সেই সময়কার শাসনব্যবস্থা ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, যেখানে ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আস্থার সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করবে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে কেবল দ্য ইকোনমিস্টই নয়, বরং টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও প্রায় একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছে। গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান যখন সুদীর্ঘ সময় পর দেশে ফেরেন, তখন রাজধানী ঢাকার রাজপথে জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে ইকোনমিস্ট লিখেছে, একটি বুলেটপ্রুফ বাসে চড়ে তিনি যখন বিমানবন্দর থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সমর্থক তাকে একনজর দেখার জন্য রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমিয়েছিলেন। সমর্থকদের চাপে বাসটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অত্যন্ত ধীর গতিতে চলতে বাধ্য হয়। সমর্থকদের এই বাঁধভাঙা জোয়ার প্রমাণ করে যে, দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিন্দুমাত্র কমেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাময়িকীটি একটি তিক্ত সত্য তুলে ধরেছে। তাদের মতে, ২০০৮ সালের পর দেশে আর কোনো যথাযথ বা স্বচ্ছ নির্বাচন হয়নি। এর ফলে বর্তমান ভোটার তালিকায় থাকা প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ কোনোদিন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ একটি বিশাল প্রজন্ম জানেই না সত্যিকারের ভোট উৎসব কেমন হয়। নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর গবেষক শাফকাত মুনির এই প্রতিবেদনের জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ করে বলেছেন যে, তার জীবনের দুই দশকে নিজের ভোটের কোনো কার্যকর মূল্য তিনি দেখতে পাননি। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। ঢাকার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ব্যানার ও পোস্টার শোভা পাচ্ছে, যা দীর্ঘদিন পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, এই সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং একটি অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। ইকোনমিস্ট মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের এই দুই দায়িত্ব পালনে অনেকাংশেই সফল হয়েছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের কিছু যুগান্তকারী প্রস্তাব তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং কোনো ব্যক্তি যেন দুই মেয়াদের বেশি অর্থাৎ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই সংস্কারগুলো মূলত ভবিষ্যতে আবারও কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঠেকাতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

নির্বাচনের এই সমীকরণে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়েও আলোকপাত করেছে ইকোনমিস্ট। দলটি দাবি করছে যে তারা নির্বাচিত হলে সব নাগরিকের জন্য একটি সংযত ও ইনসাফভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করবে। তবে দলটির এই অগ্রযাত্রা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে কিছুটা উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে। সাময়িকীটি উল্লেখ করেছে যে, জামায়াতে ইসলামী এবার নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া অতীতে জাতীয় সংসদে দলটির আসন সংখ্যা ১৮টির বেশি না হওয়ায় দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। এই শূন্যতা বা আস্থার অভাবই মূলত তারেক রহমান ও তার দল বিএনপির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। জনমত জরিপগুলোতেও বিএনপি এখন পর্যন্ত অনেক এগিয়ে রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

তারেক রহমানের পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথাও ইকোনমিস্ট পাঠকদের মনে করিয়ে দিয়েছে। তার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়া, যিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারেক রহমান এখন তার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে না ধরলেও আশ্বস্ত করেছেন যে, তার দল ক্ষমতায় এলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে এবং তরুণদের জন্য বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে যাতে বাংলাদেশি যুবকরা বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি পেতে পারে। পরিবেশ রক্ষায় তিনি বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো এবং পানির সংকট নিরসনে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি ভালো মানিয়ে নিতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাসী। তিনি ট্রাম্পকে একজন দক্ষ ও বাস্তববাদী ব্যবসায়ী হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তার সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটাবে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের বিচার নিশ্চিত করার ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করবেন না। তার মতে, প্রতিহিংসার রাজনীতি কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনটি শেষ হয়েছে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ দিয়ে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, লন্ডন থেকে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ফিরে আসা এই তারেক রহমান আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও ভিন্ন। তার কথাবার্তায় এখন রাষ্ট্রনায়কোচিত গাম্ভীর্য ও সহনশীলতা প্রকাশ পাচ্ছে। যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো কেউ কেউ কোনো বিশেষ পক্ষের সম্ভাব্য জয় নিয়ে কিছুটা আশঙ্কায় আছেন এবং প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করছেন, কিন্তু পরিবর্তনের হাওয়া যে বইছে তা স্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ এখন ১২ ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যা নির্ধারণ করবে দেশের আগামী দিনের ভাগ্য এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রূপ।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে ৫ কোটি ৩৩ লাখ বা প্রায় ৪২ শতাংশ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এই জেনারেশন জেড ভোটাররাই মূলত নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা এই তরুণদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ভোটার স্থানান্তরের যে বিতর্ক চলছে সে সম্পর্কে পরিসংখ্যান বলছে যে, এবার মোট ভোটারের প্রায় ৬ শতাংশ এলাকা পরিবর্তন করেছেন যা পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ বা এফডিআই বর্তমানের ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো যদি পরবর্তী সংসদ গ্রহণ করে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি নতুন মডেল হিসেবে পরিচিতি পাবে।