দেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে, বিপরীতে উন্নতি হয়েছে ১২টিতে। সংস্থাটির মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো নাজুক এবং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ হতে পারে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনরুদ্ধারের পথ আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, অর্থনীতির নেতিবাচক প্রবণতাগুলোর অনেকগুলোই সাময়িক নয়; বরং এগুলোর পেছনে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা।
যেসব সূচকে অবনতি
সিপিডির পর্যালোচনায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি, সরকারের ব্যাংকঋণ, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি, বিদেশে কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতির কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মতো কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উন্নত সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে।
অর্থাৎ অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। তবে যেসব জায়গায় অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় দুর্বল সূচকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
শিল্পে কর্মসংস্থানের চাপ
অর্থনীতির দুর্বলতার অন্যতম বড় উদাহরণ শিল্প খাত। সিপিডির হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা
সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সিপিডির অনুমান, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।
সিপিডি বলছে, অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে শুধু বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি, রাজস্ব, সরকারি ব্যয়, অবকাঠামো, ডিজিটালাইজেশন ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
সামনে কী করতে হবে
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত সময়ের জন্য বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্বল্পমেয়াদি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অর্থনীতির বর্তমান চিত্র তাই একদিকে কিছু ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে, অন্যদিকে সামনে বড় চ্যালেঞ্জের কথাও জানাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।