ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে 'সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগানকে কেবল রাজনৈতিক বুলি নয়, বরং বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ, প্রটোকল হ্রাস এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধিতে তিনি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাকে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১. ভোগবিলাস ত্যাগ: ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর পথচলা
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও সাধারণ জীবনযাপনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এখন থেকে সরকারি গাড়ি, চালক কিংবা রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবহার করবেন না। পরিবর্তে তিনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যাতায়াত করছেন।
কেবল তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় দীর্ঘ গাড়ি বহরের যে সংস্কৃতি ছিল, সেখানেও কাঁচি চালিয়েছেন তিনি। ১৩-১৪টি গাড়ির বহর কমিয়ে মাত্র ৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটাতে রাস্তার দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বা ‘স্ট্যান্ডিং প্রটোকল’ বাতিল করা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সাধারণ চলাচলের সময় গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করারও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
২. সচিবালয়মুখী প্রশাসন ও ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ
ভিআইপি চলাচলের কারণে রাজধানীর সাধারণ মানুষের দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি কমাতে মন্ত্রিসভার বৈঠকগুলো এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে অধিকাংশ সময় সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে ও ঝুলে থাকা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সপ্তাহে ছয় দিন অফিস করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতি শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খোলা থাকবে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক নতুন কর্মস্পৃহা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৩. সংসদ সদস্যদের ত্যাগ: শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বর্জনের ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রীর দেখানো পথ অনুসরণ করে বিএনপির সংসদ সদস্যরাও এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকে তারা জানিয়েছেন, এবার কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি (Luxury Jeep) কিংবা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। দলের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, সরকারি ব্যয়ের লাগাম টানতে এবং জনগণের করের টাকার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই নীতিগত সিদ্ধান্ত।
৪. ১৮০ দিনের রোডম্যাপ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার ১৮০ দিনের একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ সাকি জানান, এই রোডম্যাপের আওতায় থাকবে:
ফ্যামিলি কার্ড: স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে দ্রুত খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
পরিবেশ ও উন্নয়ন: দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ এবং মৃতপ্রায় খাল খনন কর্মসূচি।
গণমাধ্যম কমিশন: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন।
৫. মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশেষ নির্দেশনা
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে দৃশ্যমান পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।
শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান: দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।
পররাষ্ট্র নীতি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে প্রতিটি মিশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন রমজান: রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই ‘মিনিমালিস্ট’ বা স্বল্প-ব্যয়বহুল রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘প্রভু’ সুলভ আচরণের পরিবর্তে ‘সেবক’ হওয়ার মানসিকতা তৈরি হবে। তবে এই সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যন্ত এর সুফল পৌঁছানোই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অনলাইন ও অফলাইনে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপগুলো ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। নেটিজেনরা বলছেন, যদি সত্যিই প্রটোকল সংস্কৃতি বন্ধ হয় এবং সংসদ সদস্যরা বিলাসিতা ত্যাগ করেন, তবে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্য খুব বেশি দূরে নয়।