পানিবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে উপকূলজুড়ে

খুলনার উপকূলজুড়ে সুপেয় পানির সংকট শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগও ছড়াতে শুরু করেছে। কয়রার ৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকসহ উপকূলীয় এলাকায় বেশ কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক পানিতে ডুবে আছে। ফলে ওই সব এলাকায় চিকিৎসাসেবা গতিহীন হয়ে পড়েছে। মেডিক্যাল টিম থাকলেও বাঁধ ভাঙা থাকার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দুর্গম এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না।

প্লাবিত এলাকায় এখন খাবার পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সেখানকার লোকজনকে অনেক দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। প্লাবিত এলাকার বেশিরভাগ নলকূপের পানি পানযোগ্য নয়। খাবার পানির প্রধান উৎস পুকুর ডুবে যাওয়ায় পিএসএফ থেকে পানি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার বড় পাত্রগুলোও খালি পড়ে আছে। শুকনো জায়গা না থাকায় কেউ ভেলায় চড়ে, আবার কেউ লোনাপানি ভেঙে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য দূরের গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন।

কয়রার দশালিয়ার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গত ৩ দিন ধরে আমরা ১০টি পরিবার মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছি। কিন্তু গত রবিবার দুপুর পর্যন্ত কোনও ধরনের চিকিৎসাসেবা বা খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়নি। এখানে শিশুসহ ৬-৮ জন ডায়রিয়াসহ নানা সমস্যায় রয়েছেন।’

অসুস্থ শিশুদশালিয়ার সফুরা বেগম বলেন, ‘দুই দিন ধরে পায়খানা ও বমি হচ্ছে। কিন্তু কোনও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছি না। স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিক পানিতে ডুবে থাকায় তা বন্ধ রয়েছে। আর কয়রা সদর ২৫ কিলোমিটার দূরে। যোগাযোগ সমস্যার কারণে সেখানে যাওয়াও যাচ্ছে না।

কয়রার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সদীপ বালা বলেন, ‘সাতটি কমিউনিটি ক্লিনিক পানিতে ডুবে আছে। তারপরও সেখান থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে মেডিক্যাল টিম দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত ওরস্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রয়েছে। যা সরবরাহ করা হচ্ছে।

কয়রা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আরএমও ডা. তমাল কুমার দাশ বলেন, ‘এখানে এমনিতেই ডায়রিয়ার রোগী নিয়মিত আসে চিকিৎসাসেবা নিতে। তবে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর ২-৩ দিনে এ ধরনের রোগী বেড়েছে।

কয়রার আটরা গ্রামের সাজেদা খাতুন বলেন, ‘গ্রামের সব মানুষ পাশের একটি পুকুরের পানি পান করতাম। সেটি ডুবে যাওয়ার পর তিন মাইল দূরের কালনা সরকারি পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’ এভাবে ভেলায় চড়ে পানি সংগ্রহ করতে তাদের একদিনের অর্ধেক সময় ব্যয় হচ্ছে।

উপকূলের প্লাবিত এলাকাকলেজশিক্ষক মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্লাবিত এলাকাজুড়ে এখন খাবার পানির কষ্ট দেখা দিয়েছে। দূর থেকে খাবার পানি আনার কষ্টে অনেকেই এলাকার নলকূপের আয়রনযুক্ত কষ পানি পান করছেন। এতে অনেক পরিবারের সদস্যদের ইতোমধ্যেই পেটের পিড়া দেখা দিয়েছে।

গৃহিনী সালমা বেগম বলেন, ‘দুর্যোগের দিন অনেক বৃষ্টি হয়েছিল। তখন অনেকেই পানি ধরতি পারলিও আমরা পারিনি। সে সময় গাঙের পানির তোড়ে সব ভাসায়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। তখন ঘরের মালামাল ও বাচ্চা-কাচ্চা সামলাতি আমাগের হিমশিম অবস্থা। খাবার পানি ধরার সময় পাইনি।

কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. বায়জিদ হোসেন বলেন, ‘দশহালিয়া বেঁড়িবাধ ভেঙে মহারাজপুরে প্রায় সব এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত শুক্রবার ও শনিবার দুপুরের জোয়ারের পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ দুই দিনে রাস্তায়ও পানি উঠেছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে এখানকাবাসীকে।

কয়রার বাসিন্দা মো. কবির বলেন, ‘মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়ার ২টি ক্লোজার দিয়ে নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় বিভিন্ন সড়কে নতুন করে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার ও শনিবারের জোয়ারের পানিতে আবারও প্লাবিত হয়েছে অনেক গ্রাম। পানির চাপে গ্র্যাজুয়েট গ্রাম ও বাগালি ইউনিয়নের কিছু অংশ নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। ফলে হাজার হাজার বিঘা মৎস্য ঘের, ফসলি জমি, বসতঘর, মসজিদ, দোকানঘর ও একটি খেয়াঘাট হুমকির মুখে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রেও আশ্রয় নিয়েছেন ঘরহারা ও প্লাবিত মানুষ। তবে পাঁচটি স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধ মেরামত করায় এখন সেসব স্থানে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার (২৮ মে) ভোর থেকে দুপুরের জোয়ারের আগ পর্যন্ত দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা বেড়িবাঁধ, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেঁতুল তলারচর, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের পদ্মপুকুর, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠের কোনার ২টি বেড়িবাঁধ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করেন ভুক্তভোগীরা।

উপকূলের প্লাবিত এলাকামহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বাবলু বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের কারণে ঢেউয়ের আঘাতে ২৬ মে বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। পানি প্রবেশ করে লোকালয়ে। সেই ভাঙা বাঁধ দিয়ে জোয়ারের সময় পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রীতিশ মণ্ডল বলেন, ‘আগে থেকেই এ এলাকায় খাবার পানির সংকট রয়েছে। নলকূপ সফল না হওয়ায় বৃষ্টির পানি ও পুকুরের পানি এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা। তবে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় সমস্যা হয়েছে। সেইসঙ্গে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসের পক্ষ থেকে প্লাবিত এলাকার বিভিন্ন জায়গায় বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্লাবিত জনগণের মাঝে পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট প্রদান করা হয়েছে।

কয়রা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘শুক্রবার কয়েকটি বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়েছে। তবে মহারাজপুরের ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে শুক্রবার রাস্তা ছাপিয়ে যায়। সেখান থেকে বাগালি ইউনিয়নের অন্তত আরও ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তবে যেসব স্থানে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে সেসব স্থানে পানি নেই। তবে এখনও প্রায় ৪০ গ্রাম প্লাবিত রয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘খাবার পানির চাইতে এখন ঘর গৃহাস্থলি ও গোসলের পানির বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে। মানুষ যে করেই হোক খাবার পানি জোগাড় করতে পারছে কিন্তু গোসলের পানি পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে লোনা পানিতেই সে কাজ সারতে হচ্ছে।

DTbangla

Comment As:

Comment (0)