সাকিব আল হাসানদের চ্যালেঞ্জিং লাইফ!
বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা সাকিব আল হাসান সম্প্রতি নতুন এক বিতর্কের মুখে পড়েছেন। বিতর্ক যেন কিছুতেই তাঁর পিছু ছাড়তে চাইছে না। আইসিসির এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সাকিব আল হাসান যখন সবে মাত্র খেলার মাঠে ফিরছেন, ভক্ত-অনুরক্তরা মাঠে নতুন করে তাদের প্রিয় তারকার ক্রীড়াশৈলি দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, তখন নতুন এ বিতর্ক তার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বিতর্ক অবশ্য সাকিব আল হাসানের জন্যে নতুন কোন বিষয় নয়। কখনও তাঁর পরিবারের সাথে বিরূপ আচরণকারী দর্শকের সাথে মেজাজ দেখিয়ে, কখনও বোর্ডের সাথে বিবাদে জড়িয়ে, আর বছরখানেক আগে জুয়াড়ির দেয়া ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন করার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তিনি একের পর এক সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। তবে, এবারের বিতর্কের প্রকৃতি একটু ভিন্ন। কলকাতার কোন এক পুজোর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, তাঁর সমালোচকদের ভাষায় এ অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধনের’ খবরে ভীষণ চটেছেন দেশের একটি মহল। তাঁরা মনে করেন, সাকিব একজন মুসলিম হয়ে ওভাবে পুজোর অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধন’ করে মোটেই ঠিক করেননি। কোন এক ভক্ত তো রীতিমতো ফেসবুক লাইভে এসে রাম দা উঁচিয়ে তাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়ে বসেছেন। শেষ অব্দি এমনকি সাকিব আল হাসানকে সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে কারো অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকলে তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছে। এতে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে বটে, তবে পুরোপুরি নিরসন হয়েছে কিনা বলা মুশকিল।
এদেশের মানুষ ক্রিড়ামোদী। খেলা-ধুলো তাদের ভীষণ আকর্ষণ করে। ‘৭০ এর দশক পর্যন্ত দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান আকর্ষণ ছিল ফুটবল। ক্রিকেট এ দেশের খেলা-ধুলার জগতে এক রকম অপরিচিতই ছিল বলা চলে। অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ সম্ভবত এই যে, খেলা হিসেবে এটি অনেক ব্যয়বহুল, তাছাড়া জটিল সব নিয়মকানুনে পরিচালিত হয়। ‘৮০-এর দশক থেকে এদেশে ক্রিকেট বিকশিত হতে শুরু করে। আজকের এ অবস্থানে আসতে এদেশের বিগত প্রজন্মের ক্রিকেটারদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। যদ্দুর মনে পড়ে, ‘৮০ বা ‘৯০-এর দশকের কোন এক সময়ে ফুটবলের সাথে দ্বন্ধে চাহিদা মত মাঠ না পাওয়ার দুঃখে দেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা একবার রাজপথে ক্রিকেট খেলার কর্মসূচি দিয়েছিলেন। ‘৯০-এর দশকে আকরাম-বুলবুলদের হাত ধরে আইসিসি ট্রফি জেতা, পর পর ক’টি ওয়ানডে বিশ্বকাপে দু-একটি ক্রিকেট জায়ান্টকে হারিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি, প্রথমে ওয়ানডে এবং পরবর্তিতে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তি – এসব অর্জনের মধ্য দিয়ে গত কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় আজ দেশের ক্রিকেট এমন এক অবস্থানে উপনীত হয়েছে, বলতে পারেন আর কোন ক্রীড়া তার ধারেকাছেও নাই। খেলোয়াড়রা সবসময় দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও তারা তাদের পাশে থেকেছে, উৎসাহ যুগিয়ে গেছে। এদেশের মানুষের কাছে খেলাধুলা আর ক্রিকেট কেমন যেন সমার্থক হয়ে উঠেছে। তেমনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে আজকের দিনে ক্রিকেটই দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। শুধুই কি তাই? এদেশের মানুষের জন্য ক্রিকেট একটি ঐক্যের সূত্র বিশেষ, যেখানে সবাই একাকার হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রীড়াবিদেরা যখন কোন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন, তখন দেশের ১৭ কোটি মানুষের মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে, সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে কায়মনোবাক্যে তাদের সাফল্য কামনা করে। বহু দল-উপদলে বিভক্ত এ দেশটিতে আপনি তখন একটি দলই খুঁজে পাবেন, যেটির নাম বাংলাদেশ।
কালের পরিক্রমায় এ দেশ অনেক গুণী ক্রিকেটারের জন্ম দিয়েছে, যাদের উপর ভর করে দেশের ক্রিকেট আজকের অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। এক এক করে অনেকের নামই বলা যাবে, যারা সময় সময় তাদের অপূর্ব ক্রীড়াশৈলি দিয়ে দেশের ক্রীড়ামোদী জনতাকে বিমোহিত করেছেন, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল করেছেন দেশের মুখ। তবে, এসব তারকাদের ভীড়ে যে খেলোয়াড়টি ধারাবাহিকভাবে তাঁর ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে গেছেন, সকলের মনের মণিকোঠায় এক অনন্য আসন তৈরি করে নিয়েছেন, সে খেলোয়াড়টি আর কেউ নন, সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক সাফল্যের কারিগর এ জীবন্ত কিংবদন্তির ঝুলিতে দীর্ঘ সময় একই সাথে ক্রিকেটের সকল ফরম্যাটে সেরা অলরাউন্ডারের আসনটি ধরে রাখার মতো কৃতিত্ব রয়েছে। গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে তাঁর চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স তাঁকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
আপনি মনে করতে পারেন, একজন খেলোয়াড় হিসেবে যা চাওয়া-পাওয়ার থাকে, তার অনেক কিছুই সাকিব আল হাসান এরি মধ্যে অর্জন করেছেন। ক্রিকেটের প্রতি এ দেশের মানুষের অসাধারণ অনুরাগ আর এই অঙ্গনে অবিরাম আলো ছড়িয়ে যাওয়া সাকিবকে এদেশের তরুণ-যুবাদের কাছে একটি আইকনে পরিণত করেছে। সাকিবের কথাবার্তা, চলাফেরা, আহারবিহার, চিন্তা-চেতনা  এ সবই তার ভক্ত-অনুরক্তদের কাছে নিত্য আলোচনার বিষয়, অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। এড ফার্মসমুহ ত আর এমনি এমনি সাকিবদের নিয়ে নিত্য নতুন এড তৈরি করে না! এটা নিঃসন্দেহে একজন সাকিবের জন্য অতুলনীয় আনন্দের, অপরিসীম গৌরবের। সমস্যা হচ্ছে, এর ফলে বরাবর জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়, সাকিব আল হাসানদের আর ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। ক্যামেরা সব সময় তাদের অনুসরণ করে ফিরে। বলা তো যায় না, ভক্তদের শেয়ার করার মতো কখন কী মিলে যায়। কিন্তু, সাকিব আল হাসানরা ত মানুষ বৈ কিছু নন। একজন মানুষের সব কাজই ভাল হবে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে সেটা তো আপনি আশা করতে পারেন না। কিন্তু, কিছু অতি আবেগি লোক ভাবেন, এটি যেহেতু সাকিব আল হাসান, তাঁর প্রতিটি চিন্তা, প্রতি কর্ম পারফেক্ট হতে হবে। ঝামেলাটা বাঁধে এখানেই। পান থেকে চুন খসলেই গেল গেল রব উঠে, শুরু হয় দূয়ো ধ্বনি। কেন বাবা? মানুষের কি ভুল হতে পারে না? তবে, হ্যা, এটা অবশ্যই ঠিক, জন-প্রত্যাশা বিবেচনায় সাকিবদের সদা সাবধানে পা ফেলা দরকার। সাকিব যে এ বিষয়ে সচেতন নন এমন মনে করার কোন কারণ থাকতে পারে না। তারপরও সাকিব ত একজন মানুষ, ত্রুটি বিচ্যুতি হতেই পারে।
এদেশের আরও অসংখ্য মানুষের মতো সাকিব আল হাসানও একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমার বিশ্বাস, তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন। সাধারণত, এ দেশে মানুষ সব চাওয়া-পাওয়া শেষ হওয়ার পর জীবন সায়াহ্নে এসে হজ্জ্বব্রত পালন করেন। সাকিব এই তরুণ বয়সেই হজ্জ্বব্রত সম্পাদন করেছেন। শুধু সাকিব একাই নন, বাংলাদেশ টিমের অনেক খেলোয়াড় এমনকি রমজানের সময় রোজা রেখে খেলায় অংশ নেন বলে বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। যদ্দুর মনে পড়ে, কোন একদিন ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় কালে সাকিব বলছিলেন, তার টিমের বেশিরভাগ খেলোয়াড় নামাজ-কালামে অনুরক্ত। এরকম একজন সাকিব আল হাসান, যিনি একই সাথে এ দেশের তরুণ-যুবাদের কাছে একজন আইকন, পুজোর অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধন’ করতে যাবেন তেমনটি হয়তো অনেকেই প্রত্যাশা করেননি। হতেই পারে। এ বিষয়ে সাকিব আল হাসান কি বলেন তা একবার শোনা উচিত নয় কি? তাঁর ব্যাখ্যা যদি আপনার কাছে গ্রহনযোগ্য বিবেচিত না হয়, আপনি যদি মনে করেন একজন মুসলিম হিসেবে, এ দেশের হাজারো তরুণ যুবকের আইডল হিসেবে তাঁর এটা করা উচিত হয়নি, তাহলে আপনি অবশ্যই এটার সমালোচনা করতে পারেন। আপনি সরাসরি কিংবা মিডিয়ার মাধ্যমে অবশ্যই আপনার ক্ষোভ, দুঃখ, মনোবেদনা তার সাথে শেয়ার করতে পারেন। তবে, আপনি নিশ্চয়ই তাঁকে হত্যার হুমকি দিতে পারেন না। তাছাড়া, আপনার এটাও খেয়াল রাখা দরকার, আপনার সমালোচনা যেন বিষোদগারে পরিণত না হয়।
আইয়ামে জাহেলিয়াতে আরবের লোকেরা যখন বর্বরতার চরম শিখরে উপনীত হয়েছিল, ইসলাম তাদেরকে সভ্য বানিয়েছিল। শুধুই কি সভ্য? নৈতিক চরিত্রের যে অনুপম দৃষ্টান্ত আল্লাহর রাসূলের (সা:) সাহাবিরা রেখে গেছেন, তার সমতুল্য কোন উদাহরণ কি আজ পর্যন্ত পৃথিবী দেখতে পেয়েছে? কিভাবে সম্ভব হয়েছিল এ পরিবর্তন? তরবারির জোরে? নিন্দা-মন্দ, অভিসম্পাতের মাধ্যমে? কুরআনে পাকে ত আল্লাহ তাঁর নবীকে (সা:) বারে বারে এ হেদায়েতই দিয়েছেন, তিনি যেন সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় সত্যের দাওয়াত পৌঁছে দেন। ‘আর আপনি তাঁদের সাথে এমনভাবে কথা বলুন, যেন তা তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে।’ (আল-কুরআন ৪:৬৩) রাসূল (সা:) একজন মুমিনকে আরেকজন মুমিনের জন্য আয়না হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুতরাং কেউ ভুল করে থাকলে তার সমালোচনা আপনি অবশ্যই করবেন, তবে সেটা যেন হয় গঠনমূলক, সংশোধনের উদ্দেশ্যে। আপনার ভাষা যেন হয় কোমল ও মমতাময়। নচেৎ ফল হবে উল্টো, লাভ কিছু হবে না। ‘(হে নবী!) এটা আপনার প্রতি আল্লাহর রহমত যে, আপনি তাদের প্রতি কোমল। আপনি যদি কর্কশ-ভাষী, কঠোর-হৃদয় হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা আপনার চারিপাশ থেকে দূরে সরে যেত। অতএব, আপনি তাদের ক্ষমা করুন ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ (আল-কুরআন ৩:১৫৯)
সবাই ভাল থাকুন।
ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন
অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।