‘৭১-এ আজকের এই দিনে….

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন :

১৬ই ডিসেম্বর। বিজয় দিবস। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতির জীবনে যে ঘোর অমানিশার সূচনা হয়েছিল, তার অবসান হয়েছিল আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনে। একজন নেমকহারাম, ক্ষমতালোভী ও উচ্চাভিলাষী মীর জাফর আলী খান আর তাঁর দোসরদের বেইমানি এই জাতির ললাটে লিখে দিয়েছিল দুই শতাধিক বছরের জন্য গোলামির জিন্দেগি। স্বাধীনতা হারিয়ে দু’ শতাধিক বছর ধুঁকে ধুঁকে এ জাতিকে বুঝতে হয়েছিল স্বাধীনতার মূল্য। প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর দিনটি এ জাতির জীবনে ফিরে আসে, আর নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা নামের অমূল্য রত্ন একবার হারালে ফিরে পাওয়া কত কঠিন।

ঐতিহাসিকভাবে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এ জনগোষ্ঠী বরাবর স্বাধীনচেতা ছিল। পলাশীর যুদ্ধের ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের আগ পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে বেশিরভাগ সময়ে স্বাধীন রাজা-বাদশাহ কিংবা জমিদার-নবাবগণ এ অঞ্চল শাসন করেছেন। এদের অনেকেই হয়তো বিদেশি বংশোদ্ভূত ছিলেন, কিন্তু এ দেশটাকেই  নিজেদের দেশ করে নিয়েছিলেন। বৃটিশ শাসনের আগে এটি কখনও কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়নি। ভারতবর্ষে মুঘলদের প্রতাপ যখন মধ্য গগণে, তখন এ অঞ্চল বিস্তৃত মুঘল সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়েছিল বটে; কিন্তু মুঘল সম্রাটের প্রতিনিধিরাও এ অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং এর সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে গেছেন, একে পররাজ্য বিবেচনা করে বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের মত শোষণ করে দিল্লির কোষাগার স্ফীত করার চেষ্টা করেননি।

১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীকে ইংরেজ বেনিয়ারা যখন নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান তাঁর দোসরদের যোগসাজশে একরকম বিনা যুদ্ধে পরাস্ত করে, তখনও ষড়যন্ত্রকারীরা ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারেন নি, কী এক গভীর অমানিশায় এ দেশ, এ জাতির ভাগ্যাকাশ ছেয়ে যাচ্ছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিখন্ডি হিসেবে মসনদে বসে নবাব মীর জাফর আলী খান যখন বুঝতে শুরু করলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইংরেজরা তাঁকে সরিয়ে নিজেদের সুবিধে হবে ভেবে তদীয় জামাতা মীর কাসিমকে মসনদে বসায়। স্বাধীনচেতা মীর কাসিমের বিলম্বিত বোধোদয় যখন বক্সারে প্রতিরোধ যুদ্ধে রূপ নেয়, কুচক্রী ইংরেজরা এরি মধ্যে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গেছে, ফলে পরাজয় অবধারিত ছিল। মীর জাফর আলী খান আবারও মসনদে বসেছিলেন, তবে অনেকটাই ভৃত্যবৎ। তাঁর বাড়ির ভগ্নপ্রায় প্রধান ফটক ‘নিমক হারাম দেউড়ি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। সেকালে ক্ষমতা দখলে রাজ-রাজড়াদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র কোন অভিনব ব্যাপার ছিল না। মীর জাফর আলী খানদের বেইমানি ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার কারণ, এর মধ্য দিয়ে শুধু বাংলা নয়, পুরো ভারতবর্ষের পরাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিল।

তবে, এ জাতি পরাধীনতাকে কখনই সহজে মেনে নেয় নি। কখনও পরাধীন হলেও যখনই সুযোগ এসেছে, বিদ্রোহ করেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আঠারো শতকের শেষের দিকে ফকির-সন্যাসী বিদ্রোহ, উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা আন্দোলন ও  হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, বিশ শতকের শুরুতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন – এসবই এ  জনগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি তাদের ধূমায়িত অসন্তোষ ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে বারে বারে পাদ-প্রদীপের আলোয় তুলে ধরেছে। হয়তোবা সফলতা আসে নি, কিন্তু জনতার মননে আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রজ্জলিত রাখতে এসব আন্দোলন-সংগ্রাম ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে গেছে।

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি আদায়ে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এখান থেকেই ১৯০৬ সালে নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে। পরবর্তীতে এ সংগঠন মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি জানিয়ে ১৯৪০ সালে লাহোরে যে ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে সেটাও উত্থাপন করেছিলেন, এ জনপদের আরেক কৃতী সন্তান শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। শুধু কি তাই? ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহে যখন মুসলিম লীগ তেমন একটা সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়, তখনও বাংলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচন – যা কিনা পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল, তাতে বাংলায় মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১২১টি আসনের মধ্যে ১১৪টিতে জিতে বিস্ময়কর সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। মোট কথা, এ তল্লাটের লড়াকু জনগোষ্ঠীর আপোষহীন ভূমিকা মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সেদিনকার আন্দোলনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

যে পাকিস্তান অর্জনে বলতে গেলে কান্ডারির ভূমিকা পালন করেছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত কেন  নিতে হয়েছিল এ জনপদকে? ব্রিটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড পেলেও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী দ্রুত বুঝতে পারল, তাদের প্রত্যাশিত স্বাধীনতা এখনও আসেনি।  জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও কৃষ্টি-কালচারের প্রতি অবজ্ঞা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিশেষ করে উচ্চাভিলাষী সমরনায়কদের হস্তক্ষেপে বারবার গণতন্ত্রের হোঁচট খাওয়ার পরিণতিতে দিনের পর দিন পূর্ব পশ্চিমের ব্যবধান বাড়তে থাকে। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ‘৬০-এর দশকে বঙ্গবন্ধুর    ৬-দফা আন্দোলনে তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ‘৭০-এর নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল এ জনপদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত কর্মসূচির উপর এক ধরণের রেফারেন্ডাম, যেখানে গণরায় তাঁর পক্ষে এসেছিল। নির্বাচনের ফলাফল বলে দিচ্ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম অনানুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারপরও বঙ্গবন্ধু শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু, পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী জুলফিকার আলী ভুট্টোর হঠকারিতা, গণরায় মেনে নিতে অস্বীকৃতি, তাঁর পক্ষ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সামরিক সরকার কর্তৃক ‘৭১-এর ২৫শে মার্চের কালো রাতে তাঁকে উল্টো গ্রেফতার এবং এ তল্লাটের শান্তিপ্রিয় ছাত্র-জনতার উপর পাক বাহিনীর ক্র্যাক-ডাউন এতদঞ্চলের স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তুলে।

বঙ্গবন্ধু এরকম আশঙ্কা থেকে তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণে আগেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন। কাজেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেশের মুক্তির জন্যে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে এদেশের জনগণের বেগ পেতে হয়নি। দেশের বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত বাঙ্গালী সদস্যরাও বিদ্রোহ করে দ্রুত জনতার কাতারে শামিল হন। অসংখ্য শহীদের প্রাণ ও  মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অমিত-বিক্রম পাক বাহিনীকে পরাস্ত করে অবশেষে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলার দামাল ছেলেরা। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হানাদার বাহিনীকে যুদ্বের ময়দানে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে বিজয় তুলে নেয়ার এমন ঘটনা পৃথিবী এই প্রথম প্রত্যক্ষ করল। এ এক অনন্য ইতিহাস। এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর পরাজয় অনিবার্য ছিল, কারণ তারা একটি মুক্তির স্বপ্নে বিভোর ঐক্যবদ্ধ জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। মুক্তি ও বিজয়ের আনন্দ মানুষকে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। আমরাও প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠি, কিন্তু এর পেছনে দীর্ঘ সংগ্রামের কষ্ট ও বেদনার যে গভীর ক্ষত লুকিয়ে আছে, তা কি কখনও মুছে যাবে?

এ বিজয় হয়তো অত সহজ হত না, যদি না সেদিন ভারতের মতো একটি বৃহৎ প্রতিবেশী অকাতরে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসত। শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে, বিশ্বময় আমাদের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে, সেদিন ভারত আমাদের পক্ষে যে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছিল, তার তুলনা সত্যিই বিরল। সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চায়নার মতো সেদিন যারা আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ আমাদের বন্ধু। এটা বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’ – নীতির ফসল। কিন্তু, পাকিস্তান? বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু, পাকিস্তানীরা ‘৭১-এ ভূভাগের জনতার উপর যে চন্ডনীতি চালিয়েছিল, সেজন্য কি তাদের মধ্যে কোন রূপ অনুশোচনা জেগেছে?

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন

অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।