সেনা অভিযান বন্ধ করে সংকট নিরসনে সুচির ‘শেষ সুযোগ’

সেনা অভিযান বন্ধ করে রোহিঙ্গা সংকট অবসানের ‘শেষ একটি সুযোগ’ মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির সামনে আছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

সুচি এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ সংকট আরও ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনবে বলেও তিনি মনে করছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন সামনে রেখে বিবিসির হার্ডটক অনুষ্ঠানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেস এসব কথা বলেছেন।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে পুলিশ চেকপোস্ট ও সেনা ক্যাম্পে হামলার পর শুরু হওয়া ওই সেনা অভিযানে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক হারে হত্যা-ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।

ইতিমধ্যে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সরকার সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে বলছে ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই’। বেসামরিক রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের চেষ্টার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।

এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে আসছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সুচি। আর এ ভাষণকেই মিয়ানমারের সামরিক অভিযান বন্ধের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গুতেরেস বলেন, ‘এখন যদি তিনি পরিস্থিতি পাল্টাতে না পারেন, তাহলে আমার মনে হয়, বিপর্যয়টা হবে ভয়ংকর। আর সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কী করে এর সমাধান সম্ভব- তার কোনো উপায় আমি দেখছি না।’ গুতেরেস বলেন, মিয়ানমার যে এখনও অনেকখানি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, তা বেশ স্পষ্ট। আর রাখাইনে যা ঘটছে, তা সেনাবাহিনীর কারণেই ঘটছে।

এই দমন-পীড়নে যেসব রোহিঙ্গা দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছে, তাদের নিজেদের ঘরে ফেরার সুযোগ দিতে আবারও আহ্বান জানান তিনি। সোমবার (আজ) গুতেরেসের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব এর আগেও মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সুচির সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনেও কথা বলেছেন।

হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, মিয়ানমার জাতিসংঘের কথা কানে তুলছে না। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর গুতেরেস জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি চিঠি লিখেছেন। গত তিন দশকের মধ্যে তিনিই প্রথম কোনো মহাসচিব যিনি ব্যাপক ক্ষমতাধর সংস্থাটির কাছে চিঠি লিখেছেন, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের ব্যাপারে পদক্ষেপ আশা করেছেন। এরপর নিরাপত্তা পরিষদ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়।

এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনার মধ্যে সুচি এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। তবে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের খবরকে তিনি ‘ভুল তথ্যের হিমশৈল’ বলে মন্তব্য করেছেন। রোহিঙ্গাদের সমর্থনে ভুয়া খবর প্রচার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

সবার দৃষ্টি সুচির দিকে : জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলন যেদিন শুরু হচ্ছে ঠিক সেদিনই অর্থাৎ মঙ্গলবার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সুচি। সুচির এ ভাষণের দিকে এখন দৃষ্টি পুরো বিশ্বের। ভাষণে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নাকি ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীকে তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন তা নিয়ে কৌতূহলী অনেকে। ৫০ বছরের বেশি সময় সেনাশাসনের পর গত বছর ক্ষমতায় আসেন সুচি। এরপর থেকে তিনি সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন।

এএফপি বলছে, ক্ষমতায় আসার পর এটিই হবে সুচির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ। রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ নিয়ে তিনি কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও এদিন তার অবসান হবে। ভাষণের কিছু অংশ ইংরেজিতে হতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে কথা বলবেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীর ওপর তার ক্ষমতা সীমিত। মিয়ানমারে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের ওপর লেখা একটি বইয়ের গ্রন্থকার ফ্রান্সিনস ওয়েড এএফপিকে বলেন, ‘তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, তার প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্পর্ক রক্ষা। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তার কাছে গৌণ। এতে অবধারিতভাবে যে প্রশ্ন উঠছে তা হচ্ছে তিনি কী মানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু মিয়ানমারের রাজনৈতিক খেলা পুরো সম্প্রদায়কে বিসর্জন দেয়ার চেয়েও মূল্যবান।’

গত দুই বছর সুচি এমন কোনো পদক্ষেপ নেননি যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। এখন সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুচির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নকে সমর্থন করে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা। ফলে সুচি আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে জনগণের সমর্থন হারাবেন।

এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা বলছেন, আরেকটি সেনা অভ্যুত্থানের শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। জাতীয় নিরাপত্তা অজুহাত দেখিয়ে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন তাদের দমন-পীড়নকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে। এএফপি বলছে, রাখাইনের নিধনযজ্ঞকে পুঁজি করে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং এখন দেশটিতে অপ্রত্যাশিত রকমের জনপ্রিয়তা ভোগ করছেন। সেনাবাহিনীর এ শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সুচির পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সংশয় দানা বাঁধছে।