সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি : দুর্ভোগে পানিবন্দিরা

সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও খাদ্য-পানীয় সংকটসহ গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি অসংখ্য মানুষ।

আরো ৩ থেকে ৫ দিন বন্যার পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত চার দিনের উপর্যুপরি বৃষ্টি ও সীমান্তের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

পদ্মা মেঘনা যমুনা তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর তীরবর্তী জেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও নিরাপদ খাবার পানির সংকট। পানিবন্দি অবস্থায় বেশ কয়েক দিন পার হলেও সরকারি-বেসরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা এখনো পাচ্ছেন না দুর্গতরা।

এ অবস্থায় বাসস্থান ডুবে যাওয়া উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা থাকা-খাওয়ার সংকটের পাশাপাশি গৃহপালিত হাস-মুরগি, গবাদি পশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছেন।

এছাড়া মওসুমি লঘুচাপের প্রভাবে ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালীসহ দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে নদীভাঙন। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে গেছে।

শরতের আকম্মিক বন্যায় বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সারা দেশে আমন আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা এবং মেঘনা অববাহিকাসহ রাজধানীর আশপাশের নদীর পানি বাড়তে পারে।

সোমবার সকালে যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার, সরিষাকান্দিতে ৩৯ সেন্টিমিটার, আত্রাই নদীর বাঘাবাড়িতে ৯ সেন্টিমিটার সুরমা নদীর কানাইঘাটে ৭৯ সেন্টিমিটার সুনামগঞ্জে ৩৫ এবং কংশ নদীর জারিয়জাঞ্জাইলে ৭৩ সেন্টিমিটার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। প্রবল বর্ষণ ও ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধির ফলে নদের তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই উপজেলার পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর ডুবে গেছে।

বন্যার পানির চাপে রৌমারী উপজেলার গাছবাড়ি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রৌমারীর বন্দবেড়, দাঁতভাঙা, কোদালকাটি, মোহনগঞ্জ, ইউনিয়নের অসংখ্য ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। এছাড়াও দুই উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রায় ৬০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন এলাকা ডুবে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোন সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নদীভাঙন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তিস্তার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের কবলে পড়েছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। গত দু’দিনের ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাঙপাড়ার মার্জিনাল ডাইক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাউবো আগে-ভাগে কাজ করলে এমন পরিস্থিতি হতো না।

ব্যাঙপাড়ার পূর্বের ৫০০ ফুট ভাঙনের পর আবার মার্জিনাল ডাইকের ১০০০ ফুট এলাকার ব্লক পিচিং ধসে গেছে। ৪০ পরিবারে বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গজঘন্টা ইউনিয়নে ছালাপাক এলাকায় ৬শ’ পরিবার ভাঙন হুমকির মুখে পড়েছে।

গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের ধামুর ও নোহালী ইউনিয়নের বৈরাতি এলাকায় উপবাঁধের ১শ’ ফুট করে ব্লক পিচিং ধসে গেছে। কোলকোন্দ সাউদপাড়া এলাকা নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়েছে।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলার চরফ্যাশনে মেঘনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পৌরসভার ২টি গ্রামসহ উপজেলার ৯ টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম তৃতীয়বারের মতো প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে বসতভিটা, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২ লাখ মানুষ। স্থানীয়রা জানায়, চরমদ্রাজের বেড়ি বাঁধ মেরামত না করায় মেঘনার পানি ঢুকে উপজেলার অর্ধশত গ্রাম পানিতে থৈ থৈ করছে।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, সারিয়াকান্দি ও ধুনটে যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্পার ভেঙে গেছে। ভয়ে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। যমুনার পানি এখন বিপদ সীমার ৩৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কামালপুর গ্রামের শাজাহান আলী জানান, বরিবার দিবাগত গভীর রাতে সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর এলাকায় যমুনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় আশপাশের লোকজন ভয়ে দূরে আশ্রয় নেয়।

রবিবার রাত ৩ টায় ওই বাঁধে ৫০ মিটার ধসে গেছে। ধুনটের শহরাবাড়ি এলাকায় ৭২৭ মিটার স্পারের মাথার ঢালাই, ১৫০ মিটারের ৫০ মিটার যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকায় জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। তলিয়ে গেছে ১০ হাজার হেক্টর জমির আউশ, আমন, বীজতলা ও শাকসবজির ক্ষেত।

এছাড়া পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শতাধিক বাড়িঘর। বন্যায় রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গত তিন দিন ধরে পানিবন্দি জীবন যাপন করছে মানুষ। পানির তোড়ে গৃহহীন হয়েছে অনেক পরিবার। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানি সংকট।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর জানান, তার ইউনিয়নের ৮০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। অসময়ে বন্যা হওয়ায় আমন চাষে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তাহের জানান, গত ২৪ ঘন্টায়, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রে ১৯ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ধরলা নদীর ফেরিঘাট পয়েন্টে ৩ সে.মিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুই করছে। তবে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ২১ সে.মিটার হ্রাস পেয়েছে ও নুনখাওয়া পয়েন্টে দুধকুমর নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, তিস্তা যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীসহ গাইবান্ধার সব নদীতে ব্যাপক হারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে চরাঞ্চলের ১৬টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম। এ সব এলাকায় বেশির ভাগ বাড়িতে কোমর থেকে হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩২ হাজার পরিবারসহ গবাদিপশু। পানিবন্দি এসব পরিবারে অনেকের ঘরে খাবার চাল থাকলেও তারা চুলা জ্বালাতে পারছে না। ফলে তারা এখন শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় জেলার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদী তীরবর্তী ৫টি উপজেলায় অন্তত ৫০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

সোমবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৪০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে দুপুরে বিপদসীমার কিছুটা নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কাজীপুর উপজেলায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় অনেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। গবাদি পশু নিয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়েছে। এ পর্যন্ত বানভাসি মানুষের সাহায্যে সরকারি বেসরকারি কোন পর্যায় থেকেই সহায়তা আসেনি।

এদিকে কাজ না থাকায় বন্যাকবলিত এলাকার দিনমজুরেরা পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন-যাপন করছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বাবুল চন্দ্র শীল বলেন, পানি বৃদ্ধি আরও ৪-৫ দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, বনা কবলিত সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে বন্যার্ত ও পানিবন্দি মানুষজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে জামালপুর জেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীতে ৪৭ সেন্টি মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যমুনা নদীতে বন্যার পানি বিপদ সীমার ৩৩ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সোমবার রাতে ইসলামপুরের নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ওই বাঁধ ভেঙে যায়। অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে যমুনার বামতীর প্লাবিত হয়েছে।

ইসলামপুরের পশ্চিম বামনা, শিংভাঙ্গা ও পূর্ব বেলগাছা গ্রামের প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার যমুনা তীরবর্তী অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর রোপা আমন, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার চৌধুরী জানান, গত ৩দিন ধরে উজানে বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢালে যমুনায় ব্যাপকহারে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যার পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার ইসলামপুরের বেলগাছা পয়েন্টে যমুনার বামতীরে নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়েছে।

আরো ৩ দিন এ পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান নবকুমার।

রাজশাহী প্রিতনিধি জানান, পদ্মার বোয়ালিয়া পয়েন্টে ১৭ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। উজানে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে এবারো পদ্মায় প্রবাহ বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ভাঙছে রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধের ৫ নম্বর গ্রোয়েন থেকে ৩ নম্বর গ্রোয়েনের মধ্যবর্তী প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে দুই কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন তীব্র।

গত কয়েক দিনের ভাঙনে পদ্মা নদী একেবারে শ্মশানের ভেতর প্রবেশে করেছে। আর নবগঙ্গা এলাকায় ভাঙন একেবারে শহর রক্ষা বাঁধের কাছে চলে এসেছে। রাজশাহী চারঘাট ও বাঘার চরাঞ্চল এবং গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ এলাকাতেও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। সুলতানগঞ্জ এলাকায় পদ্মার ভাঙন থেকে রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জ মহাসড়ক রয়েছে প্রায় ৫শ’ মিটার দূরে।